প্রকাশ: সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা │ একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমানের ফেসবুক পাতায় সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে উত্থাপিত বক্তব্যগুলো নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। মুস্তাফিজুর রহমানের পোস্টে সিভিল এভিয়েশনে সামরিক আধিপত্য, নব্য ‘‘কনসালট্যান্ট সিন্ডিকেট’’–এর নিয়ন্ত্রণ, চাকরিতে অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক পদায়ন ও বহির্বিশ্বের অপব্যবহারের আশঙ্কাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আবর্তিত হয়েছে। এসব দাবি ও নজিরভিত্তিক পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে এই প্রতিবেদনটি সামাজিক মাধ্যমের সূত্র, স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদন এবং অনলাইনে পাওয়া প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই-পর্যালোচনার ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করছে।
মুস্তাফিজুর রহমান তার লেখায় বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে গঠিত নিয়ম ও আধুনিক সিভিল এভিয়েশন ব্যবস্থার আদলে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে সামরিক – বিশেষত বিমান বাহিনীর – কর্মকর্তাদের ব্যাপক উপস্থিতি সুশাসন ও দক্ষতা গঠনে অন্তরায় সৃষ্টি করছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিভিল এভিয়েশনের নানা মেধা নির্ভর পদে রিটায়ার্ড ও সার্ভিং এয়ারফোর্স কর্মকর্তা অধিক সংখ্যায় নিয়োগ পেয়েছেন এবং অনেকে দীর্ঘকালীন সময় ধরে সেই পদগুলো দখল করে আছেন। এই ঘটনাপ্রবাহকে তিনি ‘কমান্ড-চেইন’ ভিত্তিক নিয়োগ ও কাজকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যা কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট, নাগরিক দক্ষতা বিকাশে বাধা এবং কন্ট্রোল-ভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে, এমনটাই তার দাবি।
লিখিত বক্তব্যে মুস্তাফিজুর রহমান আরও অঙ্গীভূত করেছেন যে ডেপুটেশন বা সাময়িক দায়িত্ব সংক্রান্ত পদ্ধতিতে বিমান বাহিনীর অফিশারদের ছোট-মেয়াদি নিয়ে আসা হলে তারা সিভিল এভিয়েশনের আইন, বিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলীতে দক্ষতা গড়ে তুলতেও উপযুক্ত সময় পান না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁরা কনসালট্যান্টদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং ওই কনসালট্যান্টদের স্বার্থে নীতি-নির্ধারণ ঘটে—এটিও তাঁর রায়ের অংশ। তিনি উল্লেখ করেন যে কনসালট্যান্টদের অংশগ্রহণ যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা নির্মাণকে বাধাগ্রস্ত করে। এসব পর্যবেক্ষণ তিনি বিভিন্ন যুগের নিয়োগ ও প্রাক্তন কর্মকর্তাদের কার্যাবলীর উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
মুস্তাফিজুর রহমানের পর্যালোচনায় একটি গুরুতর দিক ছিল—রাষ্ট্রীয় শাখাগুলোর ওপর অনাশ্চর্য বিদেশী প্রভাব বা ‘হুক-আপ/হানি-ট্র্যাপ’-এর আশঙ্কা। তিনি মন্তব্য করেছেন যে গত দশকগুলোয় বিভিন্ন সেনাবাহিনী-কেন্দ্রিক ও সিভিল কর্মকর্তা-প্রশিক্ষণ বিদেশে প্রদত্ত হওয়া সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও নিয়োগের অ্যারেঞ্জমেন্ট তৈরির ঘটনা আছে বলে অভিযোগ উঠেছে; তবে একই লেখায় তিনি জোর দিয়েছিলেন যে এসব দাবি প্রমাণভিত্তিক তদন্তে আনতে হবে এবং কটাক্ষ করে সরাসরি কোনো দেশের ওপর অভিযোগ প্রমাণ করা অনুচিত। সাংবাদিকি নীতি মেনে বলা যায়, এসব অভিযোগ বিস্তৃতভাবে যাচাই ও প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত বিবেচনার দাবি রাখে না; ঠিকই, খবরের গ্রহণযোগ্যতার জন্য তদন্ত ও প্রামাণ্য নথি অপরিহার্য।
এই ধরনের দাবি-উৎপত্তি ও অভিযোগকে উপলব্ধি করতে গেলে প্রাসঙ্গিক তাত্ত্বিক এবং বাস্তব প্রেক্ষাপটও দেখতে হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সিভিল এভিয়েশন ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা সীমিত রাখতে নীতিমালা প্রচলিত আছে। অনেকে বলেন, অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যবহার করা যেতে পারে কিন্তু তা প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতিতে হওয়া উচিত। মুস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নির্দিষ্ট সময় থেকে ডেপুটেশন ও সরাসরি নিয়োগে সামরিক-কেন্দ্রিক প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সিভিলিয়ান ক্যারিয়ার পাথ ও দক্ষতা গঠনে বাধা দেখা দিয়েছে। এই চিত্র-ছবিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত নীতিনির্ধারক, সরকারি পরিসংখ্যান ও নিয়োগ নথি খতিয়ে না দেখা পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে উপসংহারে পৌঁছানো যাবে না; তবে এটি অবশ্যই নীতি-পরামর্শ ও স্বচ্ছতা বিষয়ে আলোচনার জন্য যথেষ্ট কারণ দেয়।
অভিযোগগুলোতে উল্লেখিত আরেকটি দিক হলো কনসালট্যান্ট-নির্ভরতা ও মেয়াদোত্তীর্ণ চুক্তির দীর্ঘায়ন। মুস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য মতে, নির্দিষ্ট কুচক্রী কনসালট্যান্টদের কারণে মন্ত্রণালয়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাত ও অনিয়ম দেখা গেছে এবং মন্ত্রলয়কে ধীরগতিতে গলিয়ে ফেলা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন যে কনসালট্যান্টদের কার্যক্রম সীমিত, তদারকির আওতায় আনা এবং স্বল্পমেয়াদি করে স্থানীয় সক্ষমতা গঠনের ওপর জোর দেয়া উচিত। এধরনের পয়েন্ট নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং প্রশাসনিক রিফর্ম বিশেষজ্ঞরাও সাধারণভাবে উপস্থাপন করেন; সুষম ও গণতান্ত্রিক প্রশাসনের জন্য স্থানীয় সক্ষমতা সৃজন অপরিহার্য বলে তারা মনে করেন।
রিটায়ার্ড ও সার্ভিং সেনা কর্মকর্তা নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে ধরনের সামাজিক ও কৌটিল্যজনক আভাস মুস্তাফিজুর রহমান দিয়েছেন, তা নিয়ে কয়েকটি সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রাখা হয়েছে। প্রথমত, যোগ্যতা-ভিত্তিক নিয়োগ ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা কেমনভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, যেখানে ডেপুটেশন প্রচলিত তাতে দক্ষতা স্থানান্তর ও রোল-ক্লিয়ারিটি কিভাবে বজায় রাখা হয়? তৃতীয়ত, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট রোধে কী ধরনের গাইডলাইন প্রযোজ্য এবং বাস্তবে তার বাস্তবায়ন কেমন হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আমরা যোগাযোগ করেছি বিমান পরিবহন ও সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রণালয়, যেখানে প্রাথমিকভাবে মন্ত্রণালয়ের প্রবক্তারা বলেছেন যে তারা যে কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে দেখেন এবং নিয়োগ, ডেপুটেশন ও চুক্তি-সংক্রান্ত শাসনব্যবস্থা নিয়মাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। মন্ত্রণালয় সূত্রের আশ্বাস অনুযায়ী প্রয়োজন হলে অভ্যন্তরীণ অডিট ও স্বাধীন তদারকির মাধ্যমে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের পরিকাঠামো এবং দুর্যোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে সিভিল ফাংশনে সামরিক আধিপত্য কমানো প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষত যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বিকাশ সমস্যায় পড়ে। তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অংশগ্ৰহণ হয়ত দরকারি হলেও তা প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে করতে হবে; অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। উদ্দেশ্যভিত্তিক নিয়োগ, স্বতন্ত্র নিয়োগ বোর্ড ও নিরপেক্ষ মনোনয়ন পদ্ধতিই সমাধানের পথে প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য করা হয়।
অন্যদিকে মানবাধিকার ও সুশাসন বিকাশে নিয়োজিত একজন নাগরিক সমাজ কর্মী আমাদের কাছে মন্তব্য করে বলেছেন যে কোনো সংবেদনশীল অভিযোগ—বিশেষত ‘‘বিদেশি প্রভাব’’ বা ‘‘হানি-ট্র্যাপ’’ প্রকার বিরল অভিযোগ—প্রমাণভিত্তিকভাবে তদন্তে আনতে হবে এবং এসব অভিযোগের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রেখে প্রাসঙ্গিক আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, জনমনে সন্দেহ থাকলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধিই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার।
এই ঘটনার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবও বিবেচ্য। মুস্তাফিজুর রহমানের লেখা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ায় কিছু পেশাদার মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে যদি সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার নিয়োগ নীতিতে সমস্যা থেকে থাকে এবং তা বহিঃজনের দৃষ্টিতে যথাযথভাবে সমাধান না হয়, তাহলে এগুলো দীর্ঘমেয়াদে জননিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আস্থা-আমেজকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও নিরাপত্তা অংশে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক সংকেত দেয়। ফলে নীতিনির্ধারকদের এখন সময়োপযোগী ও মাপকাঠি-ভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
প্রব্লেম-স্টেটমেন্টের অপর ব্যপারে, মুস্তাফিজুর রহমান নিজেও লিখেছেন যে তাঁর উদ্দেশ্য কোনো দিকে ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়; বরং তিনি দেশগত আগ্রহেই এই অবস্থা তুলে ধরছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সুপারিশ করেছেন যে প্রাসঙ্গিক তথ্য-নথি উন্মুক্ত করে, গণতান্ত্রিক পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যে কোনো অভিযোগের সন্ধান ও সমাধান করতে হবে। তিনি বলেছেন, আগামীর জন্য প্রশাসনিক সংস্কারে স্থানীয় সক্ষমতা গঠন, নিয়োগে স্বচ্ছতা ও কনসালট্যান্ট-নির্ভরতার অবসান প্রয়োজন।
সংবাদ আকারে উপস্থাপনের এই পর্যবেক্ষণটি লেখকের নিজস্ব দাবিকে উদ্ধৃত করে এবং একই সঙ্গে বলছে যে এসব অভিযোগ প্রমাণীভূত না হলে তা দোষারোপের মাত্রা পায়; তাই নিরপেক্ষ ও আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে তদন্ত অপরিহার্য। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা সংস্থা ও তফসিলভুক্ত পক্ষের মন্তব্য আনা পর্যন্ত বিষয়টি জনধারনায় রাখছি এবং উচ্চ পর্যায়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
এই প্রতিবেদনে ব্যবহারকৃত উপাত্তসমূহ সামাজিক মাধ্যম (মুস্তাফিজুর রহমানের ফেসবুক পোস্ট), স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অনলাইনে উপলব্ধ নীতি-বিশ্লেষণী প্রবন্ধের ওপর ভিত্তি করে সংকলিত হয়েছে।