নির্বাচিত সরকার ছাড়া বাংলাদেশে ঋণ নয়-আইএমএফ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৫ বার
নির্বাচিত সরকার ছাড়া বাংলাদেশে ঋণ নয়-আইএমএফ

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, নির্বাচিত সরকার ছাড়া তারা ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করবে না। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে চলমান সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি ঝুঁকিতে পড়বে, যা তাদের অর্থায়ন সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বার্ষিক সভার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর আইএমএফ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে তহবিলের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশকে প্রদেয় ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি—যার পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলার—বর্তমানে স্থগিত থাকবে। তারা আরও বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত সরকার গঠিত হলে তবেই নতুন করে আলোচনা শুরু হবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার লিখিত নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফ।

আইএমএফের এই অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নে নতুন এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, বাজেট ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই সিদ্ধান্তটি বড় ধাক্কা হতে পারে। দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফের এই সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

বাংলাদেশ সরকার গত বছর আইএমএফের কাছ থেকে মোট ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন পায়, যা সাতটি কিস্তিতে ছাড়ের কথা ছিল। ইতোমধ্যে পাঁচ কিস্তির অর্থ পেয়েছে বাংলাদেশ। এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্য, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, এবং বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে নীতি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা আইএমএফকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে।

ওয়াশিংটনের আলোচনায় আইএমএফ কর্মকর্তারা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করলেও বলেন, “টেকসই সংস্কার কেবল তখনই সম্ভব, যখন একটি নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার দায়িত্বে থাকবে।” তারা জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আইএমএফের এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত। ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ (বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিস), এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আইএমএফ সাধারণত ঋণ প্রদানে রাজনৈতিক অবস্থান নেয় না, তবে যখন নীতি বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে থাকে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই অপেক্ষার কৌশল নেয়। বাংলাদেশে নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলবে।”

সরকারি এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আইএমএফের বার্তাটি কূটনৈতিকভাবে দেওয়া হলেও এটি মূলত সরকারের প্রতি একটি বার্তা—নীতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।”

বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৯ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই পরিস্থিতিতে আইএমএফের অর্থ ছাড় বিলম্বিত হলে আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং সাধারণ মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় এখন অপেক্ষা করছে আইএমএফের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। তারা আশাবাদী যে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে আলোচনার নতুন পর্ব শুরু হবে এবং সংস্কারমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে কিস্তির অর্থ শিগগিরই পাওয়া যাবে।

তবে আইএমএফের এই বার্তা স্পষ্ট—গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ছাড়া তারা নতুন করে কোনো অর্থ ছাড় করবে না। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, যা বাংলাদেশের আগামী দিনের আর্থিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত