প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আগামী ১৮ নভেম্বর। প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ। এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের আফগানিস্তান বনাম মিয়ানমার ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ঢাকার আধুনিকতম ফুটবল ভেন্যু বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায়। এই আয়োজনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ফুটবল অবকাঠামো ও সংগঠনের সক্ষমতা আরও উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই দিনে জাতীয় ফুটবল দলের জন্যও রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে এএফসি বাছাইপর্বে মাঠে নামবে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। অর্থাৎ, একদিনেই দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ—যা দেশের ফুটবলের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সূত্রে জানা গেছে, আফগানিস্তান ফুটবল ফেডারেশন (এএফএফ) তাদের হোম ম্যাচ আয়োজনের জন্য বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন সম্ভব না হওয়ায় তারা বিকল্প ভেন্যু হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেয়। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল প্রস্তাবটি গ্রহণের পর বসুন্ধরা কিংস সভাপতি ও বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইমরুল হাসানকে বিষয়টি অবহিত করেন। ইমরুল হাসান সম্মতি জানানোর পর দ্রুত প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু হয়।
বাফুফে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্মিত এবং এর পরিকাঠামো এশিয়ার অনেক দেশের সমপর্যায়ের। এরই মধ্যে এই মাঠে সফলভাবে আয়োজন করা হয়েছে এএফসি ক্লাব প্রতিযোগিতার একাধিক ম্যাচ। নারীদের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্ট এবং জাতীয় দলের কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এই ভেন্যুতে।
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি বাংলাদেশের জন্য গর্বের মুহূর্ত। আফগানিস্তান তাদের হোম ম্যাচের আয়োজনের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে, যা আমাদের ফুটবল সংগঠন ও অবকাঠামোর প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, উন্নত মানের ঘাসের মাঠ, অত্যাধুনিক আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাই আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আয়োজন দক্ষতাও প্রশংসিত হয়েছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং ফিফার বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে।
এর আগে গত জুনে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ভুটান ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, যেখানে আয়োজনে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের পেশাদারিত্ব আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ধারাবাহিকতায় গত মাসে হংকং ও চীনের বিপক্ষে ম্যাচ আয়োজনের সময়ও বাংলাদেশ দেখিয়েছে চমৎকার প্রস্তুতি ও সংগঠন দক্ষতা। এই ধারাবাহিক সাফল্যের ফল হিসেবেই এএফসি এবার আফগানিস্তান-মিয়ানমার ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব দিয়েছে বাফুফেকে।
বসুন্ধরা কিংস সভাপতি ইমরুল হাসান বলেন, “বাংলাদেশ এখন ফুটবলের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। এই আয়োজন শুধু আমাদের ফুটবলের সক্ষমতাই নয়, দেশের ভাবমূর্তিকেও আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে। আমরা চাই, এই ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও বড় বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের যোগ্যতা অর্জন করুক।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া শুধু একক আয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যতের সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে। ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ম্যাচ কিংবা ক্লাব পর্যায়ের প্রতিযোগিতা আয়োজনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘদিন অবকাঠামোগত ঘাটতি, সংগঠন দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অগ্রগতির অভাব নিয়ে নানা সমালোচনা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক উন্নয়ন, নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ ও বাফুফের পেশাদার ব্যবস্থাপনার ফলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এখন বাংলাদেশকে ফুটবল আয়োজনের জন্য উপযুক্ত দেশ হিসেবে দেখছে।
আগামী ১৮ নভেম্বরের ম্যাচ ঘিরে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় চলছে মাঠ সংস্কার ও সাজসজ্জার কাজ। বাফুফের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে গর্বের মুহূর্ত। একই দিনে জাতীয় দলের ভারত ম্যাচের উত্তাপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় আয়োজন দেখতে পাবে তারা। ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, “এই আয়োজন প্রমাণ করে, বাংলাদেশ শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, এখন আয়োজক হিসেবেও সক্ষম।”
বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার আলোয় যখন আফগানিস্তান ও মিয়ানমার মুখোমুখি হবে, তখন সেটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ হবে না—এটি হবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফুটবলে নবযাত্রার প্রতীক। বাংলাদেশের ফুটবল এখন নতুন আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনার পথে পা বাড়াচ্ছে, যেখানে লক্ষ্য একটাই—এশিয়ার ফুটবল মানচিত্রে নিজের জায়গা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা।