প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের এক তরুণ সদস্য আলমগীর হোসেন (২৭)। মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ফেঞ্চুগঞ্জ সেতুর ফেরিঘাট প্রান্তে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শোকের ছায়া নেমে আসে আলমগীরের গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আলমগীর হোসেন মোটরসাইকেলে করে নিজ বাড়ি নুরপুর গ্রামে যাচ্ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য হিসেবে সুনামগঞ্জে কর্মরত ছিলেন এবং কয়েক দিনের ছুটিতে পরিবারে সময় কাটাতে নিজ গ্রামে ফিরেছিলেন। কিন্তু ছুটি আনন্দ নয়, শোকের বার্তা হয়ে ফিরল তাঁর পরিবারের জন্য। রাতের অন্ধকারে ফেরিঘাটের কাছাকাছি একটি প্রাইভেটকারের সঙ্গে তাঁর মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. বিধান সরকার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক জানান, আলমগীরের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে, যা তাঁর মৃত্যুর মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।\

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতাল ও গ্রামে শোকের আবহ নেমে আসে। সহকর্মীরা বলেন, আলমগীর ছিলেন দায়িত্বশীল, শান্ত-স্বভাবের ও সহকর্মীদের প্রিয় একজন মানুষ। তাঁর অকাল মৃত্যু পুরো পুলিশ পরিবারকে শোকাহত করেছে। আলমগীরের সহকর্মী এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, “ছুটিতে বাড়ি গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর কথা ছিল তাঁর। কিন্তু ভাগ্য এতটা নির্মম হবে, তা কেউ ভাবেনি।”
নিহতের পরিবারও শোকে পাথর। আলমগীরের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ছেলেটা ছুটিতে বাড়ি এসে বলেছিল, মা-বাবার সঙ্গে কিছু দিন কাটাবে। কে জানত, এই ছুটিই হবে শেষ দেখা।” স্থানীয়দের ভাষায়, আলমগীর ছিলেন গ্রামের গর্ব, সবার প্রিয় মানুষ। ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলাপরায়ণ ও পরিশ্রমী ছিলেন তিনি, যার কারণে খুব অল্প বয়সেই পুলিশ বিভাগে যোগ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এদিকে দুর্ঘটনার পর প্রাইভেটকারটির চালক ও গাড়িটি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশ বিষয়টি তদন্তে নিয়েছে এবং গাড়িটি শনাক্ত করতে ইতিমধ্যে অভিযান শুরু করেছে। ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি জানান, “আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। গাড়িটি শনাক্তে কাজ চলছে। নিহত পুলিশ সদস্যের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ফেঞ্চুগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ফেরিঘাট এলাকার ওই অংশে রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল, স্পিডব্রেকার এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা ফের একবার নিরাপদ সড়কের দাবিতে মুখর হয়েছেন।

বাংলাদেশে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ। সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ এখনো সীমিত। আলমগীর হোসেনের মৃত্যু সেই বাস্তবতার আরেকটি বেদনাদায়ক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
যুবক বয়সেই পরিবার, সহকর্মী ও গ্রামের মানুষের ভালোবাসার মানুষটি হারিয়ে গেলেন এক মুহূর্তে। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন, দায়িত্ব ও প্রিয়জনদের কান্না আজ সিলেটের আকাশে ভারি হয়ে আছে। আলমগীরের অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে — যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।