শেখ হাসিনাসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন আজ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৫ বার
ভারতের দ্বিধা, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে নতুন উত্তেজনা

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫।  একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের ঐতিহাসিক মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি মামলায় আজ নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে আজ অনুষ্ঠিত হবে মুলতবি থাকা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি এখন বিচারিক কার্যক্রমের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

আজ সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এদিন যুক্তিতর্ক গ্রহণ করবেন। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন এই মামলায় রাষ্ট্রের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। গতকাল পর্যন্ত তিনি দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করেছেন। আজ তিনি শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ও প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।

রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন তাঁর যুক্তিতর্কে বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময় টানা দমননীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় রচিত হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি নির্দেশেই টিএফআই-জেআইসি সেল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য মিলে বিরোধী রাজনীতিক, কর্মী, এমনকি সাধারণ নাগরিকদের গুম ও হত্যার মতো নৃশংস কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল। এসব অপরাধ মানবতাবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো গুরুতর।

তবে আসামিপক্ষের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আমির হোসেন আদালতে বলেন, এই মামলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে গণআন্দোলন হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। তিনি যুক্তি দেন, শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার সেই সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও অনেক ঘটনাই সংঘটিত হয়েছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়নি।

ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এ মামলায় প্রমাণ হিসেবে জমা দেয়া হয়েছে অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিওচিত্র, সরকারি আদেশের নথি, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন। এর মধ্যে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে, এসব প্রমাণের মাধ্যমে আসামিদের দায় স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গত কয়েকটি শুনানিতে ট্রাইব্যুনালে কঠোর নিরাপত্তা লক্ষ্য করা গেছে। আদালত প্রাঙ্গণ, হাইকোর্ট মাজারগেট থেকে কাকরাইল পর্যন্ত এলাকাজুড়ে মোতায়েন ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সশস্ত্র অবস্থায় পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনা সদস্যরা আদালত প্রাঙ্গণের চারপাশে অবস্থান নেয়। এতে করে রাজধানীর ওই এলাকা জুড়ে বিরাজ করেছিল এক ধরনের চাপা উত্তেজনা।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। তারা বলছেন, ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ বিচার পর্যন্ত গড়ানো এক নজিরবিহীন ঘটনা। বিশেষত, শেখ হাসিনার মতো দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হওয়া বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার পলাতক আসামিদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। তিনি নিজের যুক্তিতর্কে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষে আনা অভিযোগের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন এবং আইনি যুক্তির মাধ্যমে কিছু অভিযোগের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে একাত্তরের যুদ্ধের পটভূমি, আওয়ামী শাসনামলের রাজনৈতিক পরিবেশ, শাপলা চত্বরের ঘটনার পুনরালোচনা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময়কার পরিস্থিতি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, আজকের শুনানিতে উপস্থাপিত যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়েই মামলাটি শেষ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর আদালত রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার রায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, আজকের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের শেষ বক্তব্যের পর ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। আদালত চাইলে আজই যুক্তিতর্ক শেষ করে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন। তবে মামলার জটিলতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত আরও একদিন শুনানির সময় বাড়াতেও পারেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই মামলাটি শুধু আইন নয়, রাজনীতি, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠছে। আদালতের দরজায় আজ তাই শুধু তিনজন আসামির বিচার নয়—একটি সময়, একটি শাসনব্যবস্থা, এবং মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের হিসাব-নিকাশের দিনও বটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত