প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর নানা অভিযোগই প্রমাণ করে যে সরকার নিরপেক্ষভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে। বুধবার দুপুরে রাজধানীর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে সবদলই অভিযোগ করে—একদল বলে সরকারে অন্য দলের প্রভাব আছে, আরেক দল বলে বিপরীত দলের প্রভাব আছে। আসলে সবদলই যখন বলে অন্য দলের লোক আছে, তখনই বোঝা যায় আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি।”
সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন ও সংলাপ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে এই মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “আমাদের কাজই হচ্ছে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, সেদিকেই নজর দিচ্ছি আমরা।”
তিনি আরও বলেন, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়—এমন কথা বলাটা পুরোপুরি সঠিক নয়। বিএনপি চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। “আমরা তাদের সেই নিশ্চয়তা দিয়েছি। তাদের বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের সীমারেখার মধ্যেই নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে, এবং কোনো দলের প্রভাবমুক্ত থেকে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করবে,” যোগ করেন আসিফ নজরুল।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একদল বা একপক্ষের সন্তুষ্টি দিয়ে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। তাই আমরা চেষ্টা করছি যেন সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।”
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও পারস্পরিক অনৈক্য রয়েছে, যা নির্বাচন নিয়ে নানা সংশয় তৈরি করেছে। “আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে কিনা, তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটি রাজনৈতিক অনৈক্যের ফল। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দিকে গেলে এই সংশয় কেটে যাবে বলে আমি আশাবাদী।”
উল্লেখ্য, জুলাই সনদ বা “জুলাই চুক্তি” ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের একটি ঐকমত্য ভিত্তিক প্রস্তাব, যার লক্ষ্য ছিল একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা। এই সনদের আওতায় প্রশাসনিক পদে পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং সব দলের নির্বাচনী প্রচারণার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, “আমরা চাই না, নির্বাচন কোনোভাবে বিতর্কিত হোক। প্রধান উপদেষ্টা নিজে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসছেন। উদ্দেশ্য একটাই—একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। যেহেতু প্রতিটি দলই আমাদের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলে, সেটাই প্রমাণ করে আমরা কারও পক্ষে নই।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যে সরকারকে সবাই নিজেদের বিপরীত পক্ষ ভাবছে, সেই সরকারই আসলে জনগণের সরকার। নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হলে শুধু কথায় নয়, কাজেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হয়। আমরা সেটাই করছি—প্রশাসনিক রদবদল থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকি—সব ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।”
এদিকে রাজনৈতিক মহলে ড. আসিফ নজরুলের এই বক্তব্যকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এখনো প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, বাস্তবে এই নিরপেক্ষতা কতটা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ফরিদুল হক মনে করেন, “নিরপেক্ষতা শুধু প্রশাসনিক নয়, মানসিক দিক থেকেও বজায় রাখতে হবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই বার্তা স্পষ্টভাবে আসা ভালো, তবে এর প্রমাণ দিতে হবে মাঠপর্যায়ে।”
অন্যদিকে, শাসকদল ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে শিগগিরই প্রধান উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টা একাধিক সংলাপের উদ্যোগ নেবেন, যাতে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়।
দেশের রাজনীতি এখন সংলাপ ও নির্বাচনের সম্ভাবনা ঘিরে যখন উত্তপ্ত, তখন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের এই মন্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন—“সব দলের অভিযোগই প্রমাণ করে আমরা কারও পক্ষে নই, বরং সবার জন্য সমান দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করছি”—এই অবস্থানই এখন সরকারের মূল নীতি।