রাশিয়ার দুই তেল জায়ান্টের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭২ বার
রাশিয়ার দুই তেল জায়ান্টের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা
Oil storage tanks stand illuminated at night at the RN-Tuapsinsky refinery, operated by Rosneft Oil Co., in Tuapse, Russia, on Sunday, March 22, 2020. Oil resumed gains on signs that the world’s biggest producers are moving toward a deal to end their price war and cut output.

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বছরে প্রবেশের প্রাক্কালে রাশিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি—তেল খাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে রাশিয়ার দুই শীর্ষ তেল কোম্পানি রসনেফট (Rosneft) এবং লুকঅয়েল (Lukoil)। এই দুই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই ক্রেমলিনের প্রধান রাজস্ব উৎস হিসেবে পরিচিত, যা রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বুধবার (২৩ অক্টোবর) ওয়াশিংটনে এক বিবৃতিতে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, “আমাদের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো রুশ সরকারের প্রধান আয়ের উৎসকে টার্গেট করা এবং তাদের যুদ্ধযন্ত্রকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। এখনই সময় যুদ্ধ থামানোর, এবং আমরা রাশিয়াকে সেই চাপের মুখে আনছি।”

অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট আরও বলেন, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনায় যে অনীহা দেখিয়েছে, সেটিই এই নিষেধাজ্ঞার মূল প্রেক্ষাপট। যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, নতুন এই অর্থনৈতিক চাপ রুশ নেতৃত্বকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করবে। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান, যেন তারা এই নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এবং সমন্বিতভাবে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে চাপে রাখে।

একই দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এক নাটকীয় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পূর্বনির্ধারিত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক ফলাফল সম্ভব নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি উভয়েই শেষ পর্যন্ত শান্তি চান। এখনই সময় এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর।”

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবার সরাসরি রাশিয়ার অর্থনীতির হৃদপিণ্ডে আঘাত হেনেছে। কারণ, রসনেফট ও লুকঅয়েল শুধু তেল বিক্রির মাধ্যমেই রুশ সরকারের বিপুল রাজস্ব যোগান দেয়। ২০২৪ সালে এই দুই কোম্পানির মাধ্যমে রাশিয়া প্রায় ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছিল, যার বড় অংশই প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বেনামে বলেন, “এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের অর্থনীতিতে সাময়িক চাপ সৃষ্টি করবে, তবে এটি আমাদের কৌশলগত সক্ষমতা দুর্বল করতে পারবে না। আমরা বিকল্প বাজার খুঁজে নিচ্ছি।” তিনি ইঙ্গিত দেন, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ রাশিয়ার নতুন জ্বালানি বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে এগিয়ে আসতে পারে।

বিশ্ববাজারেও এই ঘোষণার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশের পরপরই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক তেল বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ মার্কিন ডলারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার তেল রপ্তানিতে নতুন প্রতিবন্ধকতা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার ওপর নানা ধরণের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। তবে রসনেফট ও লুকঅয়েলের ওপর সরাসরি এই মাত্রার নিষেধাজ্ঞা এই প্রথম। এটি রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। রুবলের মানও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার তেল রপ্তানি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে, যা দেশটির বাজেটে বিশাল ঘাটতি তৈরি করবে।

এদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে এই ঘোষণাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, “রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতি ভেঙে না দিলে এই আগ্রাসন থামানো সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ইউক্রেনের জনগণের প্রতি এক ঐতিহাসিক সহায়তা।”

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে নিষেধাজ্ঞায় অংশ নিতে প্রস্তুত থাকলেও, জার্মানি ও হাঙ্গেরির মতো রাষ্ট্রগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, রুশ তেল সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে ইউরোপের জ্বালানি বাজারে বড় ধরণের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

মানবিক দিক থেকেও যুদ্ধের ভয়াবহতা ক্রমেই গভীর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের অন্তত ৪৩ হাজার সেনা নিহত এবং তিন লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াবহ—প্রায় আড়াই লাখ সেনা নিহত এবং এক মিলিয়নেরও বেশি হতাহত ও নিখোঁজ। এই বিপুল মানবিক ক্ষয়ক্ষতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয়ভাবে শান্তি আলোচনায় সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানাতে বাধ্য করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই পদক্ষেপ রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করবে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ থামবে না। রাশিয়ার তেল বিক্রিতে বিকল্প বাজার যেমন চীন, ভারত ও তুরস্কের দিকে ঝোঁক বাড়তে পারে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাশিয়ার লেনদেন জটিল করে তুলবে, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল রাশিয়ার অর্থনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে রাশিয়ার যুদ্ধ তহবিল বন্ধে উদ্যোগী হচ্ছে, অন্যদিকে নিজ দেশের জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানিকে আরও প্রসারিত করার চেষ্টা করছে।

সবমিলিয়ে, রসনেফট ও লুকঅয়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি রাশিয়ার যুদ্ধ নীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত এক বড় বার্তা। এখন বিশ্বজুড়ে নজর থাকবে—এই নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার ওপর কতটা প্রভাব ফেলে এবং এটি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত