তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরাতে আপিল শুনানির তৃতীয় দিন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৬ বার
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি চলছে

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে দাখিল করা মামলার তৃতীয় দিনের চূড়ান্ত আপিল শুনানি আজ বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) শুরু হয়েছে। সকাল ১০টার পর থেকে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এ শুনানি চলছে। এই শুনানি ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে, কারণ মামলাটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবারের এই শুনানির মধ্য দিয়ে মামলাটি এক ঐতিহাসিক মোড়ের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন আইনজীবী ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা। আদালতের ভেতরে এবং বাইরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এর আগে বুধবার (২২ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং ১৪তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে তা কার্যকর করার দাবিতে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী। তিনি আদালতের উদ্দেশে বলেন, জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষিত করতে হলে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই সে লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, “যদি রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসে, তবে তা কি সংসদের ক্ষমতাকে খর্ব করবে না?” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি একধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে গণ্য হবে? যদি হয়, তবে তার সাংবিধানিক অবস্থান কী হবে?” প্রধান বিচারপতির এসব প্রশ্ন আদালতের ভেতরে উপস্থিত আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

রিটকারী আইনজীবীরা যুক্তি দেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়, বরং এটি জনগণের অধিকার রক্ষার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। তারা বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।

এর আগের দিন, মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) প্রথম দিনের শুনানিতে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি আদালতে বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার ফলে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পুনর্বহাল না হলে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”

সেদিন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও তাদের যুক্তি পেশ করেন। বিএনপির পক্ষে উপস্থাপিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানোই একমাত্র সমাধান। রাষ্ট্রপক্ষ অবশ্য এর বিরোধিতা করে বলে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার সমাপ্তি হয়েছে, যা পুনর্বহাল করলে সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে নির্বাচনের সময়কালীন নিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করতে একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়, যা ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োগ করা হয়। তবে ২০১১ সালে হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেয়।

এ বিষয়ে আদালতের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা হলে ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর বদিউল আলম মজুমদারসহ আরও পাঁচজন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার পৃথকভাবে আপিল করেন।

সাংবিধানিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই মামলার রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। কারণ রায়ের ফলাফল অনুযায়ী হয়তো নির্বাচনের ধরন, নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো কিংবা সংবিধানের প্রয়োগ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এদিকে, আদালতের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি গণতন্ত্রের সুরক্ষা-বলয় হিসেবে প্রয়োজনীয়, আবার কেউ মনে করেন, এই ব্যবস্থা অতীতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি করেছিল।

আদালতের পরবর্তী শুনানি আগামী রোববার (২৬ অক্টোবর) নির্ধারিত হয়েছে। সেই দিন রাষ্ট্রপক্ষ তাদের চূড়ান্ত বক্তব্য পেশ করবে বলে জানা গেছে। এর পরেই আদালত রায় ঘোষণার তারিখ দিতে পারে বলে আইনজীবীরা ধারণা করছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই মামলার গুরুত্ব নিয়ে এখন সকল মহলে আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, এটি কেবল একটি আইনি বিতর্ক নয়, বরং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও প্রশ্ন। আদালতের রায়ের দিকে তাই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত