সৌদি আরবের নতুন গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালেহ আল-ফাওযান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৫ বার
সৌদি আরবের নতুন গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালেহ আল-ফাওযান

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সৌদি আরবের ধর্মীয় ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো আজ। দেশটির বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ এক রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামিক চিন্তাবিদ শেখ সালেহ আল-ফাওযানকে সৌদি আরবের নতুন গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এই নিয়োগ এসেছে ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সরাসরি সুপারিশের ভিত্তিতে। খবর সৌদি গেজেট ও আরব নিউজের।

রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী, শেখ সালেহ আল-ফাওযানকে গ্র্যান্ড মুফতির পাশাপাশি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় পরিষদ “কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলার্স”-এর চেয়ারম্যান এবং “পার্মানেন্ট কমিটি ফর স্কলারলি রিসার্চ অ্যান্ড ইফতা”-এর প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই তিনটি পদই সৌদি আরবের ধর্মীয় নীতি, ফতোয়া জারি এবং ইসলামী আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বহন করে।

প্রয়াত গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ আল-শেখের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গায় একজন অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য আলেমকে বেছে নেওয়াকে বিশ্লেষকরা সৌদি সরকারের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। শেখ আবদুল আজিজ গত ২৩ সেপ্টেম্বর দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর থেকেই দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল।

শেখ সালেহ আল-ফাওযানের জন্ম ১৯৩৫ সালে সৌদি আরবের আল-কাসিম অঞ্চলে। শৈশবে তিনি স্থানীয় কুরআন শিক্ষালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। পরে বুরাইদা শহরের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষে তিনি রিয়াদের কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজ অব শরিয়াহ থেকে ফিকহ বা ইসলামী আইন বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি “হায়ার ইনস্টিটিউট অব জুডিশিয়ারি”-এর পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তার নেতৃত্বে অসংখ্য ইসলামি গবেষণা, বিচার ও আইনি প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়।

১৯৯২ সালে শেখ আল-ফাওযানকে প্রথমবারের মতো পার্মানেন্ট কমিটি ফর স্কলারলি রিসার্চ অ্যান্ড ইফতা-এর সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়। এরপর তিনি কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলার্স, মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের ইসলামিক ফিকহ কাউন্সিল, এবং হজ মৌসুমে দাওয়াত ও প্রচার কার্যক্রম তদারকি কমিটি-তেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তার তত্ত্বাবধানে ইসলামি গবেষণা ও ফতোয়া জারির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে।

শেখ ফাওযান শুধু একজন ধর্মীয় পণ্ডিতই নন, বরং ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও দাওয়াত কার্যক্রমের একজন নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক হিসেবেও পরিচিত। তিনি বহু ইসলামী গ্রন্থ, ফতোয়া সংকলন ও শরিয়াহ-বিষয়ক গবেষণাপত্র রচনা করেছেন। তার লেখা বইগুলো বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রেডিও ও টেলিভিশন মাধ্যমেও তার ধর্মীয় দিকনির্দেশনা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে সৌদি রেডিওর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “নূর আলা আদ-দারব”-এ তার উপস্থাপনা এবং ফতোয়া ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম বিশ্বের কোটি শ্রোতার কাছে প্রভাব ফেলেছে।

ধর্মীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, শেখ সালেহ আল-ফাওযানের নেতৃত্বে সৌদি আরবের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় ফতোয়া, শিক্ষাব্যবস্থা, এবং সমাজে শরিয়াহ ভিত্তিক সংস্কারের ক্ষেত্রে নতুন গতিশীলতা আসতে পারে। যদিও তিনি রক্ষণশীল ধারার একজন আলেম হিসেবে পরিচিত, তবুও ইসলামি ঐক্য ও মডারেট ব্যাখ্যার মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়ে তার অবস্থান সবসময়ই স্পষ্ট।

রিয়াদভিত্তিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিয়োগ শুধু ধর্মীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং সৌদি আরবের ধর্মীয় সংস্কার নীতির নতুন দিকনির্দেশনাও বটে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যেভাবে “ভিশন ২০৩০” পরিকল্পনার আওতায় দেশকে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে নিচ্ছেন, তেমনি ধর্মীয় দিক থেকেও সংস্কার ও স্বচ্ছতার বার্তা দিচ্ছেন। শেখ ফাওযানের নিয়োগকে সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

নিয়োগের পর শেখ সালেহ আল-ফাওযান এক বিবৃতিতে বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন এই দায়িত্ব পালনে আমাকে তৌফিক দান করেন। আমি চেষ্টা করবো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলিম সমাজের কল্যাণে কাজ করতে।”

সৌদি আরবের ধর্মীয় পরিমণ্ডলে শেখ ফাওযানের মর্যাদা দীর্ঘদিনের অর্জন। তার ছাত্ররা বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত ও ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। দেশটির নাগরিকদের মধ্যে তিনি একজন কঠোর নৈতিক আদর্শ ও আলেমদের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

ধর্মীয় রাজনীতির জটিল বাস্তবতায়, শেখ সালেহ আল-ফাওযানের গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ শুধু সৌদি আরবের নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইসলামী আইন, শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তার প্রজ্ঞা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে সৌদি আরবের ধর্মীয় নেতৃত্বে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন প্রয়াত শেখ আবদুল আজিজ আল-শেখের দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা পেল, অন্যদিকে সৌদি আরবের নতুন প্রজন্ম পেলো এমন একজন ধর্মীয় নেতা, যিনি আধুনিক বিশ্বে ইসলামের মূল চেতনাকে যুক্তি ও প্রজ্ঞার আলোকে তুলে ধরতে সক্ষম হবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত