প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গাজীপুরের টঙ্গী অঞ্চলে হঠাৎ করেই তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম জনদুর্ভোগ। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তিতাস গ্যাসের চার ইঞ্চি বিতরণ লাইনে লিকেজ থেকে আগুন ধরে যাওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সেই থেকে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় গৃহস্থালী কাজ সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে টঙ্গীবাজার সেনাকল্যাণ কমপ্লেক্সের পাশে হোন্ডা রোড এলাকায়। সেখানে গ্যাস লাইনে আগুন ধরে যাওয়ার পর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পাইপলাইন মেরামতের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে পুরো পশ্চিম থানা এলাকা এবং পূর্ব থানার আংশিক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্যাসের কারণে এলাকার হাজারো পরিবার বিপাকে পড়েছে।
টঙ্গীর মিলগেট, দেওড়া, আউচপাড়া, খাঁপাড়া, পরানমণ্ডলেরটেক, গুশুলিয়া, গুটিয়া, বাকরাল, ফকির মার্কেট, কলেজগেট, তিলারগাতি, সাতাইশ, গাজীপুরা, মুদাফা, ভাদাম, মধুমিতা ও টঙ্গীবাজার—এইসব এলাকাগুলোতে সকাল থেকেই গৃহিণীদের মুখে অসহায়ত্বের ছাপ। অনেকেই জানিয়েছেন, বিনা নোটিশে গ্যাস বন্ধ করে দেওয়ায় তারা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছেন। ঘরে রান্না করা যাচ্ছে না, শিশুরা না খেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, এমনকি অনেক পরিবার হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় গৃহিণী পানসি বেগম বলেন, “বৃহস্পতিবার রাত থেকেই চুলায় গ্যাস নেই। সকালে রান্না করতে গিয়ে দেখি, চুলা একদম বন্ধ। কিছুই রান্না করতে পারিনি। এখন বাচ্চাদের নিয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।” একইভাবে টঙ্গী মুদাফা এলাকার সেলিম কাজল জানান, “রাত থেকে আমাদের এলাকায় গ্যাস বন্ধ। বিকল্প ব্যবস্থা বলতে এখন মাটির চুলা জ্বালাতে হচ্ছে। কিন্তু কাঠ বা কয়লা তো সহজলভ্য নয়।”
এদিকে, এলাকার ছোট-বড় হোটেলগুলোতে সকাল থেকেই দেখা গেছে অস্বাভাবিক ভিড়। মানুষ খাবারের সন্ধানে হোটেলগুলোতে ছুটে যাচ্ছেন। কলেজগেট এলাকার বাসিন্দা মামুন মিয়া বলেন, “বাসায় চুলায় গ্যাস নেই। সকালে পরোটা আর ভাজির জন্য হোটেলে এসে দেখি, লম্বা লাইন। সবাই একই সমস্যায়।”
শুধু গ্যাস সরবরাহ বন্ধই নয়, এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই টঙ্গীতে গ্যাস লাইনে লিকেজের সমস্যা চলছে। উত্তর আউচপাড়া, খাঁপাড়া, দেওড়া ও গাজীপুরা এলাকায় প্রায় প্রতিটি সড়কেই লিকেজ রয়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, “কেবল খাঁপাড়া এলাকায় এক কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইনের মধ্যে অন্তত ৬০-৭০টি লিকেজ রয়েছে। আমরা বারবার তিতাস কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতিবারই তারা এসে দেখে চলে যায়, মেরামত করে না।”
এই অবস্থায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, অতীতেও গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন লাগার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আবারও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হয়।
টঙ্গী মধুমিতা রোডের বাসিন্দা আব্দুর রহিম খান কালা বলেন, “রাত থেকে গ্যাস বন্ধ, সকালেও চালু হয়নি। এখন বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। তবে সবচেয়ে ভয় লাগছে লিকেজ নিয়ে। অনেক জায়গায় পাইপ ফেটে গ্যাস বের হচ্ছে, কিন্তু কেউ দেখছে না।”
বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমেও টঙ্গীর গ্যাস সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। কেউ লিখেছেন, “গ্যাসের বিল দেই নিয়মিত, কিন্তু গ্যাসই পাই না।” আবার কেউ কেউ তিতাসের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে দ্রুত তদন্ত দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে টঙ্গী তিতাস গ্যাস বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মেজবাহ উর রহমান বলেন, “বৃহস্পতিবার রাতে হোন্ডা রোড এলাকায় চার ইঞ্চি বিতরণ লাইনে লিকেজ থেকে আগুন ধরে যায়। আমরা সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করি যাতে বড় দুর্ঘটনা না ঘটে। পাইপলাইন মেরামতের কাজ চলছে। বিকেলের মধ্যেই মেরামত সম্পন্ন হলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।”
তবে স্থানীয়রা বলছেন, এটি কোনো একদিনের সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে টঙ্গীতে গ্যাসচাপ কমে যাচ্ছে, লিকেজের সংখ্যা বেড়েছে এবং তিতাস কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে পরিস্থিতি এখন বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে।
বেশ কয়েকজন স্থানীয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে তিতাস গ্যাসের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেছেন এবং দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। এক জনপ্রতিনিধি বলেন, “আমরা চাই, শুধু এই একটি লাইন নয়, পুরো টঙ্গীর গ্যাস পাইপলাইন নতুনভাবে সংস্কার করা হোক। মানুষকে প্রতিদিন এই দুর্ভোগ ভোগ করতে দেওয়া যায় না।”
অন্যদিকে, স্থানীয় হোটেল মালিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের ব্যবসাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তারা বলছেন, বিকল্প হিসেবে তরল গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু এতে খরচ দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
টঙ্গীতে চলমান এই গ্যাস সংকট এখন পুরো অঞ্চলের জন্য এক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্না না করতে পারা, শিশু ও বৃদ্ধদের খাদ্য সংকট, আর অফিসগামীদের সময়মতো নাশতা না পাওয়া—সব মিলিয়ে এলাকাবাসী এক অচলাবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
জনগণের প্রশ্ন এখন একটাই—তিতাস কতদিন এই সাময়িক সমাধানে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি এবার সত্যিই স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটবে তারা?
টঙ্গীর গ্যাস সংকট হয়তো আজ বা কাল মেরামতের পর কিছুটা প্রশমিত হবে, কিন্তু দীর্ঘদিনের এই অনিয়ম ও অবহেলার জাল ছিন্ন না হলে আবারও এমন বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে