প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মাগুরা থেকে: বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দেশি-বিদেশি কোনো প্রভাব বা চাপ নেই বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। শুক্রবার মাগুরা সদরের নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
শফিকুল আলম বলেন, “নির্বাচন কমিশন বারবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ আর স্বাধীনভাবে নির্বাচন করতে পারবে না। দীর্ঘ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাচনী জোরজবরদস্তি ও সাধারণ মানুষ ও ছাত্রছাত্রীদের ওপর দমনমূলক আচরণ চলে আসছে। জুলাই ও আগস্ট মাসে শত শত সাধারণ মানুষ ও ছাত্রছাত্রীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের পরও আওয়ামী লীগ কোনো অনুতপ্ত প্রকাশ করছে না। দেশের মানুষ তাদের আচরণ দেখেছে এবং এর প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করছে।”
তিনি আরও বলেন, “আগে নির্বাচনের সময় একটি আসনে কখনো একজন প্রার্থী থাকত, আর কেউ নির্বাচনে অংশ নিত না। এমন একক প্রার্থীর জন্য সংশোধনী আনা হয়েছে যাতে সাধারণ ভোটারও ভোট দিতে পারেন। এর মূল কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দেখা ঘটনাকে প্রতিহত করা। তখন দেশের ১৫৪টি আসনে ভোটারদের একক প্রার্থীর মধ্যেই ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না, ফলে নির্বাচনের প্রকৃত মুল্যায়ন হয়নি। নির্বাচন হওয়ার আগেই প্রার্থীরা বিজয়ী ঘোষিত হয়েছিলেন। এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এক গভীর সংকটের মুহূর্ত ছিল। আমরা চাই দেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার পূর্ণভাবে প্রয়োগ করতে পারে এবং নির্বাচিত প্রার্থীকে নিজ হাতে নির্বাচিত করতে সক্ষম হোক। এই পরিবর্তনটি সেই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে করা হচ্ছে।”
শফিকুল আলমের বক্তব্যে উঠে আসে আগামী নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় রাজনৈতিক মহলসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনের প্রস্তুতিতে একমত হয়েছেন। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা চাই এই নির্বাচন হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ এবং ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন। সকল রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ যেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং নির্বাচিত হতে সক্ষম হয়, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “নির্বাচনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। মৌসুমী বর্ষা শেষে দেশজুড়ে নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও নির্বাচনী প্রস্তুতি ত্বরান্বিত হবে। আমাদের লক্ষ্য, দেশব্যাপী প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটাররা তাদের স্বতঃসিদ্ধ অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।”
এ সময় তিনি দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেশের প্রতিটি নাগরিককে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। আমাদের লক্ষ্য দেশের গণতন্ত্রের শক্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপন করা। এর জন্য কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা বিদেশি চাপ থাকবে না। প্রতিটি পদক্ষেপই স্বচ্ছতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।”
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পমাল্য অর্পণের সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদির, সদর থানার ওসি আইয়ুব আলী, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। স্থানীয় বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ নাগরিকরাও এতে অংশ নেন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শান্তি ও সংহতির বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
শফিকুল আলমের বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে আগামী নির্বাচনের প্রক্রিয়া দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনগণের ভোটাধিকারকে কেন্দ্র করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রেস সচিবের মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক পক্ষের নির্দেশ নয়, বরং দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপের একটি প্রতীক। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ভোটপ্রক্রিয়ার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমস্ত স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দেশে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। শফিকুল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থী মনোনয়ন ও প্রচারণার ক্ষেত্রে সতর্ক ও দায়িত্বশীল হবে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সমস্ত প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনের জন্য অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নির্বাচনের কেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন, ভোটারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনী অশান্তি রোধে সক্রিয় থাকবে।
শফিকুল আলমের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে যে, আগামী নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হবে। দেশের জনগণ যেন নিজেদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রার্থীকে নির্ধারণ করতে পারে এবং যে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি, চাপ বা অন্যায় প্রভাব থেকে দূরে থাকে, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।
সংক্ষেপে, প্রেস সচিব শফিকুল আলমের মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এবং ভোটারের অধিকারকে কেন্দ্র করে। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে ফিরিয়ে আনা কোনো বিদেশি বা রাজনৈতিক চাপের ফসল নয়, এটি স্বতঃসিদ্ধ প্রক্রিয়া ও দেশীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। এছাড়া, ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করা এবং দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।
এই উদ্যোগ ও মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে, কিন্তু এটি নিশ্চিত করছে যে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে।