ঐক্যবদ্ধ দাবি: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও সুশীল গোষ্ঠীর ঘোষণা (ইসকন) বাংলাদেশের কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪২ বার
ঐক্যবদ্ধ দাবি: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও সুশীল গোষ্ঠীর ঘোষণা—International Society for Krishna Consciousness (ইসকন) বাংলাদেশের কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ঢাকা — সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিভিন্ন ধর্ম-শিক্ষা ও ছাত্র-সংগঠন, পাশাপাশি আইনজীবী ও সামাজিক গোষ্ঠী একত্রে উঠে এসেছে এই দাবিতে যে, ইসকন (International Society for Krishna Consciousness)-এর সব কার্যক্রম বাংলাদেশে বন্ধ করা হোক। এই দাবির পটভূমিতে রয়েছে সংগঠনের কার্যক্রম ও প্রতিক্রিয়া-শীল সামাজিক পরিবেশ। একই সঙ্গে রয়েছে আদালতের সিদ্ধান্ত, সরকারের অবস্থান ও সাধারণ জনমতের চিত্র।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম শনিবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন অনুষ্ঠানে বলেছেন, ইসকনকে «বাংলাদেশ থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত»। তার কথায়, “ইসকন হলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য একটি বিষফোঁড়া। ইসকন বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগের আমলে এই ইসকনের কার্যক্রমে পারমিশন দেওয়া হয়েছে—বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারতীয় প্রভাবের কাছে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও যুক্তি দিয়ে বলেন যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চাকরি পাননি এমনদের ইসকন-কেন্দ্রিক কার্যক্রমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, বেতন বাড়ানো হয়েছে—এরূপ শর্তাবলীও আছে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলছেন, ‘‘ইসকনের কার্যক্রমগুলো আমাদের দেশে এক অপরাজক সংখ্যালঘু ট্রামকার্ড খেলে বাংলাদেশে একটা ক্যু করতে চেয়েছিল।’’

সাদ্দাম এই দাবিতে আরও বলেছেন, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ রয়েছেন, এবং রাষ্ট্রকে এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে যাতে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়। তবে যদি কোনো ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তাহলে সেটির বিষয়েও আলোচনা হওয়া জরুরি। এই প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘সংখ্যালঘু হয়েই যদি কোনো সংগঠন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতায় হস্তক্ষেপ করে, তাহলে আমরা চুপ থাকতে পারি না।’’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট অতিথি।

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

এই দাবিগুলো একদমই নতুন নয়। ইতিপূর্বে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ চট্টগ্রামে একটি র‌্যালিতে ‘ইসকনকে নিষিদ্ধ করা হোক’ স্লোগান দেওয়া হয়। হেফাজতের বক্তব্য—ইসকন একটি “হিন্দুস্থানভিত্তিক উগ্র সংগঠন” যা দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক একতা ভঙ্গ করছে।  একইভাবে, ছাত্রসমাজের বিভিন্ন অংশ যেমন বাংলাদেশ ইসলামী যুবশিবির-এর মতো সংগঠনও ইসকনের বিরুদ্ধে দাবি তুলেছে।  আইনগতভাবেও বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি এসেছে: একসময়ে আদালতে একটি রিট দায়ের করা হয় যাতে ইসকনের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হোক।

যদিও দাবি ব্যাপক, কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত একাধিকবার এই ধরনের নিষিদ্ধকরণের নির্দেশ দেয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা হাইকোর্ট ২৮ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে ইসকনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার রুল জারি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, “সরকার ইতিমধ্যে আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে”। সরকারের পক্ষ থেকেও এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসকন নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।  এই অবস্থানে দেখা যাচ্ছে যে, যদিও সামাজিক দাবিগুলো রয়েছে, আইন ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এখনও তা পূর্ণরূপে কার্যকর হয়নি।

দাবিদারীরা বলছেন, ইসকনের কার্যক্রম শুধু ধর্মীয় নয়—অধিক গুরুত্বপূর্ণভাবে এটি সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছে। তাদের মতে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুরা ইসকনের কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন, চাকরিতে বা সমাজে অংশগ্রহণে অন্য রীতি রপ্ত করছেন এবং রাষ্ট্রীয় শাসন ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে এটি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই যুক্তির আলোকে তারা দ্রুত নিষিদ্ধকরণের দাবি তুলছেন। অন্যদিকে, সংগঠন বা এর প্রতিনিধিরা বলছেন, তারা বাংলাদেশে নিবন্ধিত, ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম চালাচ্ছে, এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত নয়। তারা জানিয়েছে যে, অনেক দাবিই “ভিতর্কিত প্রচার” বা রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ।

সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, ইসকন-বিরোধী দাবির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে একাধিক ঘটনা: যেমন চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার পর ইসকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তৎপরতা এবং জনগণের উদ্বেগ উভয়ই বাড়েছে। এখানে একটি প্রশ্ন আছে: ইসকনের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম রয়েছে কি না, এবং রাষ্ট্র কতটা এই বিষয়টি অনুসন্ধান করেছে বা করবে—এগুলি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কোনো ধর্মীয় সংগঠন যদি আইন উলঙ্ঘন করে, তাহলে আইন ও শাসনের নামে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে হয়রানিমূলক বা এক-পক্ষীয়ভাবে কোনো সংস্থাকে চিহ্নিত করা হলে সেটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসকনের কার্যকলাপ, দাবিদারদের বক্তব্য ও সরকারের অবস্থানের মধ্যে একটি সংবেদনশীল ভার বজায় রাখতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে যে, সামাজিক ও ছাত্র-সংগঠনগুলো একদিকে ইসকনকে নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার দাবিতে সক্রিয়; অন্যদিকে, আইন-প্রশাসনের ক্ষেত্রে এখনও পুরোপুরি নিষিদ্ধকরণের পথে যেতে হয়নি। এটি একটি দ্বিধান্বিত অবস্থান তৈরি করেছে—কেউ বলছেন “তৎপর ব্যবস্থা নেই”, কেউ বলছেন “প্রক্রিয়া চলছে, সময় লাগবে”।

একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া-দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবা যেতে পারে: যদি সরকার বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইসকনের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, আর সংস্থা নিজে স্বচ্ছতা বাড়ায়—তাহলে বিরোধ কম হতে পারে। অন্যদিকে, যদি দাবিগুলো তীব্র হয়, আইনগত চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।

ইসকনকে নিষিদ্ধ করার দাবিটি শুধু এক সংগঠনের কার্যক্রম নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়—এটি ধর্মীয় সংষ্কৃতি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় শাসন ও সামাজিক শান্তি-সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। ছাত্রশিবিরের সংস্কৃতিতে এই দাবিই এক নতুন অধ্যায় খুলেছে। তবে যে পথে এগোতে হবে, সেটি শুধু সিদ্ধান্ত-গ্রহণ নয়; তার সঙ্গে থাকতে হবে আইনগত বিচার, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সামাজিক সহমর্মিতা।

সে কারণে আজ একটি সংকেত পাওয়া যাচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সমাজে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর ভূমিকা পুনর্মূল্যায়নের মুহূর্ত এসেছে। পাশে থাকবে-বা বাধার মুখে পড়বে, সেটি নির্ভর করবে রাজনৈতিক সভ্যতা, আইন ও দায়িত্বশীলতা-এর ওপর। বর্তমানে দাবিদার-সংগঠন-সংস্থা-সরকার এই তালিকায় নিজ-নিজ অবস্থান নিয়ে রৈখিকভাবে এগোচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ অপেক্ষায়—কি হবে আগামী অধ্যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত