“সচিবালয় এখন সবচেয়ে বড় স্বৈরতন্ত্র ও গুণ্ডামির আস্তানা হয়ে উঠেছে” — হাসনাত আব্দুল্লাহ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্য মানা হবে না: হাসনাতের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সাপ্তাহিক আলোচনা ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করার পর দেখা যাচ্ছে, হাসনাত আব্দুল্লাহ’র এই মন্তব্য শুধুই ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি নয়—এটি একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিফলন বহন করছে। তিনি বলেছেন, “সচিবালয় আমাদের সাধারণ মানুষ হিসেবে গণ্যই করা হয় না” এবং “এটি এখন সবচেয়ে বড় স্বৈরতন্ত্র ও গুণ্ডামির আস্তানা হয়ে উঠেছে।” এই মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-(এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হিসেবে, এক গুরুত্বপূর্ণ সময়সূচিতে।

মুল বক্তব্য তিনি রোববার বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন-এর (বিসিএস) পরীক্ষা অগ্রগতি সংক্রান্ত আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাখেন। তিনি বলেন, “বিমান মাইলস্টোন স্কুলে না পড়ে সচিবালয়ে পড়া উচিত”—যার মধ্য দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক ধরনের বিশেষ আধিপত্য ও অচলচিত্র।

হাসনাতের মতে, জুলাইয়ে শুরু হওয়া গণ-অভ্যুত্থানের (Quota Reform/বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন) মধ্যপ্রচেষ্টায় অব্যাহত থাকা হয়ায়, আজও বিসিএস-প্রক্রিয়ায় সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়ে গেছে। তিনি জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এখনো ভাগ-বাটোয়ারা ও পোস্টিং নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন, যার কারণে নিয়োগপ্রার্থীর ম্রুণ ত্রুটি ও অনিয়মের ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, “চাকরিপ্রার্থীরা মেনুতে নেই। যারা সেখানে দায়িত্বে আছেন, তারা সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। এই অদক্ষতা ও উদাসীনতার ফলেই নতুন প্রজন্মের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে।”

আলোচ্য কথাবার্তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, তিনি অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হয়েছেন আমলা-বাহিনী। “তারা নিজেদের পদোন্নতি নিশ্চিত করেছে, কিন্তু সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের দুর্ভোগ এখনও কমেনি,” এমন অভিব্যক্তি তার। তিনি সতর্ক করে বলেন—যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নীতি এবং নিয়োগ-বিধিতে সংশোধন আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে “লাল ফিতার দৌরাত্ম্য” (নিয়োগ-পরামর্শে ঘুষ, দূর্নীতি) থেকে চাকরিপ্রার্থীরা মুক্তি পাবে না।

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

এই মতামতের প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু বিষয় নজরে আসে, যা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বর্তমান অবস্থা ও জন-আশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমত, তিনি পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সচিবালয় একসময় সাধারণ মানুষের মুক্ত গমনাগমন ও আলোচ্য কেন্দ্র ছিল, কিন্তু এখন সেটি বিপথে গিয়েছে। এই ধরণের বক্তব্য একেবারেই নতুন নয়: আগেও তিনি বলেছিলেন, “সচিবালয় যাতে ধানমন্ডি‑৩২-এর মতো হতে না পারে” (যেখানে একসময় রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবন ছিল) – যা ছিল প্রশাসনিক চরম অবহেলার প্রতীক।

দ্বিতীয়ত, তার বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নিয়োগ-পরামর্শ, পোস্টিং-বদল, আপস-বিনিময়ের মতো দীর্ঘস্থায়ী অভিযোগ—যা একারনে নিয়োগপ্রার্থীরা ধীরে ধীরে বোঝতে পারছেন যে সঠিক প্রতিযোগিতার সুযোগ নেই। এই বেদনায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে তার কণ্ঠ দিচ্ছে ভাবার বিষয়। তৃতীয়ত, প্রশাসনী সংস্কারকে তিনি জরুরি উল্লেখ করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে তিনি এখনই সংস্কারে নামার আহ্বান জানিয়েছেন—তাতে শুধুই অনিয়ম বন্ধ হবে না, বরং জনবিশ্বাস পুনরুদ্ধারও হবে বলে তিনি মনে করছেন।

তবে এই ধরনের উল্লেখযোগ্য অভিযোগ ও দাবি তুললেও, সেখানে যাচাইযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। যেমন, বিসিএস-পরীক্ষার সমন্বয়হীনতা-দূর্নীতির সংখ্যাগত পরিমাপক কোনো সরকারি রিপোর্ট বা জনস্বকারী হিসেবে প্রকাশিত হয়নি। এছাড়া, সচিবালয়ে কর্মরত কতজন কর্মকর্তা নিয়োগ-পরামর্শে লিপ্ত, তার নির্ভরযোগ্য তালিকা পাওয়া যায়নি। তাহলে কেন এই সময়ে এবং এইভাবে হাসনাত এই অভিযোগ তোলায়? এর পেছনে রাজনৈতিক এক উপলব্ধি থাকতে পারে—যে তিনি ‘নির্বাহী এপ্রোচ’রা (বিউরোক্রেসি) জনগণের প্রতিরোধ উপার্জন করছে বলে মনে করছেন, এবং এই প্রতিরোধকে রাজনৈতিক ঢালে পরিণত করছেন।

এখানে আরও প্রশ্ন যায়—এই ধরনের মন্তব্য দিয়ে বাস্তব সমস্যার দিক কতটা উন্মোচিত হয়? উদাহরণস্বরূপ, “লাল ফিতা”-ব্যবস্থা নিয়োগে বন্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে কি নেই, তা একমাত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষিই বলবে। সেই মাপদণ্ড কি আগে থেকেই ছিল, কি কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে? সরকারের রূপায়ণাধীন নিয়োগ-পরিদর্শন ও স্বচ্ছতা নীতিমালার বাস্তবতা কী? এসব বিষয় আলোচ্য। তথ্যভিত্তিকভাবে দেখা গেছে, সচিবালয়ের কর্মচারীরা গত মে মাসে কর্মবিরতি ও লাগাতার প্রতিবাদ করেছিল এবং সেই প্রেক্ষাপটে হাসনাতের অবস্থান এসেছে “আপনি পরিবর্তন না করলে সাধারণ মানুষ আপনাকে বদলাবে” কথায়।

তাঁর এই কথা বোঝায় যে, সাধারণ মানুষের ধৈর্য সীমায়—যদি সরকার-বিউরোক্রেটিক স্তুপ নির্ধারিত নিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ এবং কর্মদক্ষতা নিশ্চিত না করতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পথ ধরতে পারে। এটি শুধু কর্মচারীর অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—এটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া, জনবিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও।

অবশ্য, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হিসেবে বলা যায়, সরকার বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দ্রুত পাওয়া যায়নি—অথবা সাংবাদিক সমস্যা হিসেবে রিপোর্ট হয়নি। তাই একপাহাড়ে হাসনাতের দাবিকে একমাত্র সঠিক হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে এই ধরণের দাবিকে বিশ্লেষণ করা জরুরি—যেমন, প্রশাসনের তথ্যে দেখা যাচ্ছে নিয়োগ-বিধিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার বাস্তব ফলাফল এখনও সময়সাপেক্ষ। এটি জনমত-উন্মুখ সংস্কার ঘোষণা নয়; বাস্তব পরিবর্তন দরকার।

বাংলাদেশের এই সময়ে — যেখানে সরকার, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে নিয়োগ-রোগ, কার্যপ্রণালি দুর্নীতি, কর্মসংস্থান সংকট ইত্যাদি বিষয় মোকাবিলা করছে — হাসনাতের মন্তব্য একটি রূপক বার্তা হিসেবে কার্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে একথাও সত্য যে, শুধু আপত্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে বাস্তব পরিবর্তন আসে না; দরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ। সাধারণ চাকরিপ্রার্থী, কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, নিয়োগ-প্রকল্পনায় সংযুক্ত প্রতিষ্ঠান—সবকিছুই এই প্রক্রিয়ার অংশ।

যেকোনো ব্যবস্থা নেয়া হোক, সেটি হলে ভালো হয় যদি হয় যথোপযুক্ত তথ্য-প্রমাণসহ এবং জনস্বার্থে প্রণয়ন করা হয়। যেমন নিয়োগ-পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন তত্ত্বাবধান কমিটি তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সমাজের একাংশ থেকে। একই সময়ে, কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির উদ্যোগও জরুরি। অবশেষে, সাধারণ মানুষের আস্থা ও অংশগ্রহণ ছাড়া বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

এখন সময় এসেছে—যখন সরকার উন্নয়ন, নিয়োগ ও কর্মসংস্থান সংকটের মোকাবিলা করছে—সেখানে সচিবালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ কি শুধু চালু আছে, নাকি কার্যকর ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে, তা পার্থক্যের বিষয় হয়ে উঠছে। সেই প্রসঙ্গে হাসনাতের ভাষ্য শুধুই চরম একটা অভিযোগ নয়; তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিটি ‌মুহূর্তের সমস্যা তুলে ধরেছেন। তবে সাংবাদিকতার দায়িত্ব অনুযায়ী, দাবি-বচনে এবং তথ্য-ভিত্তিতে আমরা আরও গভীরে যাচাই করব। আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদনে থাকবে নিয়োগ-পরামর্শ ও পোস্টিং-বদলের তথ্য, সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ সংস্কার উদ্যোগ, এবং নিয়োগপ্রার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত