মসজিদে আমির হামজার রাজনৈতিক বক্তব্যে বাধা, ক্ষুব্ধ মুসল্লিদের হাতে বিএনপি নেতা অপদস্থ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
মসজিদে আমির হামজার রাজনৈতিক বক্তব্যে বাধা, ক্ষুব্ধ মুসল্লিদের হাতে বিএনপি নেতা অপদস্থ

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব রিপোর্টার, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

কুষ্টিয়ার বটতৈল ইউনিয়নের বরিয়া জামে মসজিদে শনিবার (২৫ অক্টোবর) বিকেল নামাজের পর এক গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। মুফতি আমির হামজা, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত এমপি প্রার্থী হিসেবে পরিচিত, মসজিদের পিউলপাঠ শেষে বক্তৃতা শুরু করলে মসজিদের কমিটি সভাপতি ও বিএনপি বটতৈল ইউনিয়ন শাখার সভাপতি শাজাহান আলী হান্নান উঠে এসে অনুরোধ করেন বক্তাকে শুধুমাত্র ইসলামিক আলোচনা চালিয়ে যেতে এবং রাজনৈতিক বক্তব্য না দেয়ার জন্য। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ রূপ নেয়। ওই মসজিদে উপস্থিত মুসল্লির একাংশ হান্নানের কথার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, তাঁকে ধাক্কা—ধুরুং করে মসজিদের ভিতর থেকে বের করে দেয়। ওই ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায় ৩ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের দৈর্ঘ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যার মাধ্যমে পুরো বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় উঠে আসে।

শাজাহান আলী হান্নান মসজিদের কমিটি সভাপতি ও বিএনপি নেতা হিসেবে বলেছিলেন, তিনি মসজিদের কমিটি সভাপতি হিসাবেই দায়িত্বে আছেন। তিনি জানান, আমির হামজা আগমনের বিষয়টি মসজিদ কমিটিকেই জানানো হয়নি। নামাজ শেষে আমির হামজা বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি শুধু অনুরোধ করেছিলেন যে আলোচনায় ইসলামিক বিষয় অবলম্বন করা হোক, রাজনৈতিক বক্তব্য না দেওয়া হোক—কিন্তু এ pedido-র পরই মুসল্লিদের কিছু অংশ হান্নানের দিকে আগ্রাসী হয়ে আসে, এবং তাকে মসজিদ থেকে বাহির করা হয়। হান্নানের ভাষ্যমতে, “আমি শুধু বলেছিলাম– হুজুর, ধর্মীয় আলোচনা যত পারেন করুন, কিন্তু রাজনৈতিক কোনো আলোচনা করবেন না। এতেই মসজিদের ভিতরে থাকা লোকজন আমার দিকে তেড়ে আসেন।”

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সুযা উদ্দিন জোয়র্ডার (Suja Uddin Joardar) আমার দেশ পত্রিকাকে বলেন, সেই সময় মুফতি আমির হামজা ওই এলাকায় গণসংযোগে ছিলেন। তিনি নামাজ শেষে মসজিদে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন এবং এক-দেড় মিনিটের মধ্যে হান্নান নামাজ শেষ হওয়ার পর বক্তৃতায় বাধা সৃষ্টি করেন বলে মুসল্লিদের অংশ ক্ষুব্ধ হয়। তিনি জানান বিষয়টি পরে মিটমাট হয়েছে।

এর আগে মুফতি আমির হামজা-র বিরুদ্ধে অতীতে বেশ কিছু সুবিচার ও বিতর্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ২০২১ সালের মে মাসে Counter‑Terrorism and Transnational Crime Unit (CTTC) কর্তৃক ধর্মাত্যবক্ষ মন্তব্য ও সহিংসতা উস্কানির দায়ে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। এছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-র ছাত্র ছিলেন বলে দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কটূক্তি করার অভিযোগে আইনজীবী শিবব উদ্দিন খান একটি আইনগত নোটিশও জারি করেছিলেন।

এই ঘটনার সম্পৃক্ত দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মসজিদ—a ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে—যেখানে মূলত নামাজ ও ধর্মীয় আলোচনা হয়, সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান নিয়ে বিরোধ এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। মসজিদ কমিটি সম্পাদক হান্নানের দাবি অনুযায়ী, বক্তৃতার পূর্ব থেকেই তথ্য বিভ্রান্তি ও তদবির সম্ভাবনা উপস্থিত ছিল: তিনি বর্ণনা করেন যে, “মসজিদের ভিতরে উপস্থিত অনেকেই আমাকে অপরিচিত ছিল। স্থানীয়দের তুলনায় বেশিরভাগ আসছিল জামায়াতে ইসলামী-র সমর্থক হিসেবে।” তিনি বলছেন, “আমি মসজিদ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমির হামজা মসজিদে আসবেন, সেটাও আমাকে কেউ জানায়নি।” তা সত্ত্বেও ঘটনাটি সহিংসতা পর্যায়ে গড়ায়, যেখানে তিনি “মুশাব্বিহ বা ধাক্কাধাক্কিতে” মসজিদ থেকে এথার অবস্থানে পড়েন।

উল্লেখযোগ্যভাবে, বিএনপি জেলা আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বলেছেন, ভোট প্রচারণার জন্য মসজিদ ব্যবহারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোরই সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, মসজিদ-আয়োজিত আলোচনায় “চালাকি” করা ঠিক নয় এবং জনমতের প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের বিবেচনা থাকতে হবে। এই মন্তব্য একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যদিকে ধর্মীয় স্থান ও নির্বাচনী কার্যক্রমের সংমিশ্রণ থেকে সৃষ্ট বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিকে সামনে নিয়ে আসে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনযোগযোগের দাবী রাখে। প্রথমত, মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় না থাকায় এমন ঘটনার উদ্ভব সম্ভব হয়েছে—যেখানে ধর্মীয় স্থান রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য ব্যবহার হয় এবং তা সংশ্লিষ্ট কমিটি-কমিউনিটির প্রত্যাশার বাইরে যায়। দ্বিতীয়ত, বক্তার আগমন ও বক্তৃতার বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্ব-নিষ্ক্রিয় তথ্য না থাকায় মসজিদ-অভ্যন্তরে যে অচেনা জনতা উপস্থিত ছিল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে; স্থানীয় কমিটির কাছে ‘আমন্ত্রণ’ ও ‘নন-আমানন্ত্রণ’ বিষয়টি দায়িত্বের আলোচনায় আসে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নেতাকে মসজিদ থেকে বাহির করার ঘটনা সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করে—যদিও বক্তব্য অনুযায়ী বিষয়টি পরে মিটমাট হয়েছে, তবে ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা শুধুই ওই দিন স্থানীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই, এখন সামাজিক মাধ্যমেও আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

উপযুক্ত তদন্ত ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অনিবার্য হয়ে ওঠে—উদাহরণস্বরূপ, মসজিদ কমিটির সভাপতি হিসেবে হান্নানের প্রতিক্রিয়া, বক্তা হিসেবে আমির হামজার বক্তব্যের ধরন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, এবং মসজিদে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানের নীতি। বিষয়টি শুধু এক-উপাদানের নয়, বরং ধর্ম, রাজনীতি এবং স্থানীয় সমাজের সংবেদনশীল ভাইবের সংমিশ্রণ।

এদিকে, ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত আমির হামজার জন্য এই ঘটনা রাজনৈতিক পটভূমিতে নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা পড়তে পারে—একদিকে তিনি জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর ধর্মীয় বক্তৃতার পরে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানের কারণে কমিটি ও মুসল্লিদের মধ্যে বিতর্ক গড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি নিজেও সামাজিক বিতর্কিত মন্তব্য ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে আলোচিত হয়েছেন।

পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন পড়বে—মসজিদ, কমিটি ও সামাজিক সংগঠনগুলো কি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ধর্মীয় কার্যক্রমকে স্পষ্টভাবে পৃথকভাবে পরিচালনার নীতিমালায় কাজ করছে কি না, স্থানীয় মুসল্লি ও কমিটি-সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সম্মতি আছে কি না, নিরপেক্ষ পরিবেশে ধর্মীয় আলোচনা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমানা কোথায় তা নির্ধারণ হয়েছে কি না। এ সংকটের মাঝেও একটি ভালো দৃষ্টিকোণ হলো, মসজিদের ভেতর এ ধরনের ঘটনা ঘটে উঠলে দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যা স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ববোধের দিকে নেওয়ার জন্য একটি সংকেত।

উপসংহারে বলা যায়, কুষ্টিয়ার ওই মসজিদ-ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত বা স্থানীয় বিবাদ নয়—এটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক ভূমিকা ও ধর্মীয় স্থানের ব্যবহার নিয়ে একটি বড় দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে। মসজিদে রাজনৈতিক বক্তব্য না দেয়া বা দেয়া—এই সীমারেখা কোথায়, মসজিদ কমিটি ও বক্তার অধিকার ও দায়িত্ব কোথায় মিলিয়ে নেয়া হয়, তা এখন ভবিষ্যৎ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণ মুসল্লি থেকে স্থানীয় কমিটি, রাজনৈতিক দল থেকে ধর্মীয় সংগঠন—সবার জন্য এটা একটি সময় যখন নিজ-নিজ ভুমিকা নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। সাংবাদিকতার দায়িত্বে, আমরা ঘটনার পরবর্তী তদন্ত, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া, কমিটির সিদ্ধান্তসহ বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন চালিয়ে যাব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত