প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শাপলা প্রতীক পেতে যে কোনো পরিস্থিতিতে রাজপথে আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিয়েছে। এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, নির্বাচন কমিশন যদি তাদের স্বাভাবিক অধিকার ও প্রতীকের প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করে, তবে এনসিপি একদিকে রাজনীতিক কর্মসূচি এবং অন্যদিকে স্বেচ্ছাচারী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আন্দোলনেও যাবে।
শনিবার দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সারজিস আলম এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘‘প্রশাসনে এখন পর্যন্ত নানা ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ দেখা গেছে। কেউ বিএনপিপন্থি, কেউ জামায়াতপন্থি, আবার কেউ পূর্বে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, তারা অনেকটাই পার পেয়ে গেছে। এ ধরনের আচরণ যদি বহাল থাকে এবং আমাদেরকে বড় ঘটনার দিকে যেতে হয়, তাহলে কেউ আর আশ্রয় বা প্রশ্রয় পাবে না।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা চাই আমাদের সদস্যরা শুধু দলীয় প্রশাসনের অংশ হবেন না, বরং দেশের প্রশাসনের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে কাজ করবেন। বাংলাদেশের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ আদালতে এমন আইনজীবী এবং বিচারক আছেন, যারা সুযোগ পেলেই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত আসামিদের জামিন দিয়ে দেন। এ ধরনের ঘটনা যদি চলতে থাকে, তবে আগামীর বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে। নির্বাচন একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।’’
সারজিস আলমের মতে, এনসিপি শুধুমাত্র দলের স্বার্থে নয়, বরং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘‘আগামীর বাংলাদেশে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার এবং বিচারিক প্রক্রিয়া ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে এককভাবে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্ব দিতে পারবে না। সেই জায়গায় এনসিপির অংশগ্রহণ এবং নিশ্চয়তা অপরিহার্য।’’
তিনি আরও জোর দিয়েছেন যে, আইনগতভাবে শাপলা প্রতীক পেতে এনসিপির কোনো বাধা নেই। ‘‘তবে নির্বাচন কমিশন যদি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে, স্বেচ্ছাচারিতা দেখায় এবং স্বাধীনতা প্রদর্শন না করে, তাহলে আগামী নির্বাচনে তাদের ওপর আমাদের আস্থা থাকবে না।’’ তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, কমিশন স্বচ্ছ ও ন্যায্য আচরণ করবে, যাতে দেশের নাগরিকরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।
সারজিস আলম জানিয়েছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জেলা আহ্বায়ক কমিটি এবং ডিসেম্বরের মধ্যে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে এনসিপি তার সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করবে।
সমন্বয় সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আহনাফ সাঈদ খানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দার, কেন্দ্রীয় নেতা খায়রুল কবির, দিদার শাহ প্রমুখ। সভায় তারা সারজিস আলমের বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন এবং দলের স্বকীয়তা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সারজিস আলমের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে যে, এনসিপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ কেবল প্রতীকের জন্য নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যও দায়বদ্ধ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আমরা যদি এখনই কঠোর অবস্থান না নিই, তাহলে নির্বাচন এবং দেশের ভবিষ্যৎকে একটি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছি।’’ এই বার্তা দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং সমর্থকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
কিশোরগঞ্জে সমন্বয় সভায় উপস্থিত মনোনয়নপ্রত্যাশীরা জানান, তারা সারজিস আলমের বক্তব্যকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছেন। তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, এনসিপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে কাজ করবেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করাই নির্বাচনী কার্যক্রমের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
সারজিস আলম আরও বলেন, ‘‘যে কোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা এবং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়াব। নির্বাচন কমিশন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাজপথের আন্দোলন ছাড়া আমাদের বিকল্প থাকবে না।’’ এই মন্তব্যে এনসিপি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, দল শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংগঠনিক ও নৈতিক দায়িত্বও পালন করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির এই অবস্থান নির্বাচনী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। দলীয় সিদ্ধান্ত ও নীতি মেনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান কার্যকর হলে, নির্বাচনী মাঠে শক্তিশালী দলগত সমন্বয় দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ বা স্বেচ্ছাচারিতা নির্বাচনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে।
পরিশেষে, সারজিস আলমের বার্তা স্পষ্ট করেছে যে, এনসিপি নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রস্তুত, তবে শাপলা প্রতীক পেতে তাদের অধিকার সংরক্ষণ এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য রাজপথে আন্দোলনের পথও খুলে রাখা হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি দলের জন্য রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, সংগঠন শক্তি এবং দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।