প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আগামী ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মেয়র নির্বাচনের আগাম ভোটে ব্যাপক উত্সাহ দেখা যাচ্ছে। ভোটাররা ক্রমশ বাড়ছে, এবং এখন পর্যন্ত রেকর্ডসংখ্যক আগাম ভোট পড়েছে। এই নির্বাচনকে শুধু স্থানীয় রাজনীতি নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতেও নজর দেওয়া হচ্ছে। এবারের নির্বাচনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলছে এক সম্ভাবনা—নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম প্রার্থী শহরের মেয়র পদে নির্বাচিত হতে পারেন।
ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি এই মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন। আগাম ভোটের তথ্য ও জরিপগুলোও তার জনসমর্থনকে দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত করছে। বিশেষ করে উদারপন্থি ভোটারদের কাছে তার প্রতিশ্রুতি আকর্ষণীয়—সব নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা, শিশুদের জন্য কেয়ার সার্ভিস, প্রায় ১০ লাখ নিউইয়র্কবাসীর বাড়িভাড়া মওকুফ করা এবং নাগরিক সুবিধার অন্যান্য পরিকল্পনা। এছাড়া, তিনি গাজায় ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন এবং মানবাধিকারের বিষয়গুলোতে জোর দিয়েছেন, যা তার সমর্থকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জাগিয়েছে।
কিন্তু সকলেই এই সমর্থনে স্বস্তি বোধ করছেন না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমোর মতো প্রাক্তন গভর্নর তাকে বারবার ইসলামপন্থি বা তৎপর ইসলামবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ধরনের আক্রমণ শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ নয়, বরং জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ও সন্দেহের বীজ বপন করছে। কুমো এবং তার সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, মামদানি যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছেন তা বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং অর্থনৈতিকভাবে ভিত্তিহীন। এই ধরনের সমালোচনা নির্বাচনী প্রচারণাকে আরও উত্তপ্ত করেছে এবং ভোটারদের মনোযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মিথ্যাচারের প্রশ্ন তুলেছে।
শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি সম্প্রদায়ও মামদানি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু ইহুদি ধর্মগুরু জনগণকে উদ্দীপিত করতে চেষ্টা করছেন যাতে তারা মামদানিকে ভোট না দেন। মূলত মামদানি ইহুদী-বিরোধী মনোভাব প্রদর্শনের অভিযোগে এই পদক্ষেপকে যৌক্তিক মনে করছেন তারা। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রার্থী রাজনৈতিক নীতির পাশাপাশি সম্প্রদায় ভিত্তিক প্রতিক্রিয়ারও মুখোমুখি।
এ বিষয়ে নিউইয়র্কের বিভিন্ন শহরের র্যাবাইরা একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিতে তারা বলেন, শহরের নির্বাচনে মামদানিকে বিজয়ী হতে দেবেন না। এ পর্যন্ত চিঠিতে এক হাজারেরও বেশি ধর্মগুরুর স্বাক্ষর জমা পড়েছে। ইতিহাসবিদরা এটিকে বিরল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করছেন। চিঠিতে যেসব ধর্মগুরু স্বাক্ষর করেননি তাদের নামও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে, যা বিতর্কের মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। এটি একদিকে ধর্মীয় প্রভাব এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংমিশ্রণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামদানির সমর্থকরা মনে করছেন, এই ধরনের প্রতিবাদ কেবল তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। সমর্থকরা বলেন, তার মানবাধিকার ভিত্তিক এবং উদার নীতিমালার কারণে, শহরের নাগরিকরা রাজনৈতিক চাপ ও ধর্মীয় ভয়কে প্রাধান্য দিয়ে ভোট দেবে না। তারা আশা করছেন, ভোটাররা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং প্রার্থীর নেতৃত্বের যোগ্যতা বিবেচনা করে ভোট দেবেন।
মৌলিকভাবে, এই নির্বাচন শুধু একজন মুসলিম প্রার্থীর জয় বা পরাজয় নির্ধারণ করবে না। এটি নিউইয়র্ক শহরের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থানের মান এবং নাগরিকদের ভোটের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার পরীক্ষাও। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই নির্বাচনের ফলাফল যদি মামদানি বিজয়ী হন, তাহলে তা প্রমাণ হবে যে, উদার ও বৈচিত্র্যবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রার্থীর জন্য নিউইয়র্কবাসী খোলা মঞ্চ তৈরি করতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, পরাজয় হলেও প্রার্থীর পরিকল্পনা এবং জনসমর্থন শহরের রাজনৈতিক মানচিত্রে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব ফেলবে।
নিউইয়র্কবাসী, বিশেষ করে অভিবাসী সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, এই নির্বাচনের দিকে নজর রাখছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এটি কেবল একটি রাজনৈতিক জয় নয়, বরং তাদের নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক স্বীকৃতির প্রতীকও হতে পারে। মামদানি নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার মানুষকেন্দ্রিক এবং সেবামূলক নীতিগুলো তুলে ধরেছেন। বিনামূল্যে বাস পরিষেবা, শিশু কেয়ার সুবিধা এবং বাড়িভাড়া মওকুফের মতো প্রকল্পগুলো তার জনগণভিত্তিক নীতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের এই উত্তাপ কেবল প্রার্থীর ধর্ম বা সম্প্রদায়ের কারণে নয়, বরং তিনি যে উদার, নাগরিকমুখী নীতি গ্রহণ করেছেন তার প্রতিফলন। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিপক্ষের আক্রমণ এবং ইহুদি ধর্মগুরুর চিঠি একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এটা দেখাচ্ছে, আধুনিক রাজনীতিতে ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্য কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারের মনোভাবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
সংক্ষেপে, নিউইয়র্কের এই মেয়র নির্বাচন শুধুমাত্র স্থানীয় প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি ধর্মীয় সহাবস্থান, রাজনৈতিক উদারতা, নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিফলন। জোহরান মামদানির প্রতিশ্রুতি এবং জনপ্রিয়তা তার সামনে স্থাপন করা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় তৈরি করছে। ভোটাররা আগামী ৪ নভেম্বর সেই সিদ্ধান্ত নেবেন, যা শুধু নিউইয়র্কের নয়, পুরো দেশীয় রাজনীতির জন্যও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।