মেট্রোরেল দুর্ঘটনায় আবুল কালামের মর্মান্তিক দাফন সম্পন্ন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩১ বার
মেট্রোরেল দুর্ঘটনায় আবুল কালামের মর্মান্তিক দাফন সম্পন্ন

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ঘটে যাওয়া মেট্রোরেলের মারাত্মক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো আবুল কালামের লাশ রবিবার গভীর রাতে তার জন্মভূমি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারচর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামে পৌঁছায়। দুর্ঘটনার পরপরই দেশজুড়ে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। রোববার রাতের এই অন্ধকারে গ্রামের মানুষদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে, যারা মর্মাহত হয়ে অপেক্ষা করছিলেন ৩৫ বছর বয়সী আবুল কালামের শেষ সাক্ষাতের জন্য।

সোমবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৯টায় ইউনিয়নের পোড়াগাছা মাদ্রাসা মাঠে আবুল কালামের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। উপস্থিত ছিলেন পরিবার, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় সমাজকর্মী এবং উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি। দাফন শেষে উপস্থিতদের চোখে জল, আর হৃদয়ে এক অদৃশ্য শূন্যতা।

নিহত আবুল কালাম ছিলেন ইশ্বরকাঠি গ্রামের মৃত জলিল চোকদারের ছেলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর ঢাকায় একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। তিনি নারায়ণগঞ্জের জলকাঠি এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। পারিবারিক জীবনে আবুল কালাম ছিলেন এক ছেলে ও এক মেয়ের মা-বাবা; তার বড় ছেলে আব্দুল্লাহ মাত্র ৫ বছর বয়সী, আর ছোট মেয়ে সুরাইয়া আক্তার মাত্র ৩ বছরের। পরিবারের জন্য আবুল কালাম ছিল একমাত্র আস্থার নাম, ঘরের সুখ-দুঃখের মূল ভরসা।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই পরিবারের সদস্যরা শোকাহত হয়ে পড়েন। তার স্ত্রী আইরিন আক্তার পিয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার সন্তানরা এখনো বুঝতে পারছে না, তাদের বাবা আর ফিরবে না। তারা বলে, ‘বাবা ঘুমাচ্ছে মা, তুমি কান্না করোনা।’ আমি কীভাবে ওদের বোঝাই যে, ওদের বাবা আর কখনো জাগবে না! আবুল কালামই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা, এখন আমি ও সন্তানরা একেবারে দিশেহারা হয়ে গেছি।” তার কণ্ঠে সেই মাতৃশোকের অতল গভীরতা প্রতিফলিত হয়।

চাচাতো ভাই আব্দুল গণি চোকদারও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “সরকারের অবহেলার কারণে আমার ভাই মারা গেল। এখন এর দায় কে নেবে? আমাদের পরিবার কোনো উত্তর পাচ্ছে না। এটি শুধু আমাদের পরিবারের ক্ষতি নয়, পুরো সমাজের জন্য এক সতর্কবার্তা।” আব্দুল গণি চোকদারের কথায় উঠে এসেছে সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের দায়িত্বের ফাঁকফোকর, যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কর্তব্য যথাযথভাবে পালন হয়নি।

মেট্রোরেলের সহকারী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান জানান, মেট্রোরেলের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাকে মেট্রোরেলের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে এবং দাফন কার্যক্রমে অংশ নিতে পাঠানো হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব পরিবারের জন্য সর্বোচ্চটুকু করা হবে, ইনশাআল্লাহ।” এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় কর্তৃপক্ষের সীমিত সমর্থন এবং সমাজের সামনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নচিহ্ন।

নড়িয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকী দাস বলেন, “আবুল কালামের মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জানাজা ও দাফনে অংশ নিয়েছি। আমরা সার্বক্ষণিক তার পরিবারের পাশে রয়েছি। পরিবারের লোকজন যে কোনো প্রয়োজনে প্রশাসনের সাহায্য পাবেন।” প্রশাসনের এই উপস্থিতি কিছুটা হলেও পরিবারকে মানসিক সহায়তা প্রদান করেছে, তবে দুর্ঘটনার পেছনের দায়বদ্ধতা ও উদ্ভূত ক্ষতির গভীরতা পুরোপুরি প্রশমিত করতে পারবে না।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দেশের রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মেট্রোরেল প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে। নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটি, তদারকি কমিটি এবং প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের অভাব এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি সম্ভাবনা উন্মোচন করছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কতটা প্রস্তুত ছিল প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষ এই ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবেলায়।

সালমানের বক্তব্যে পাকিস্তানে বিতর্ক, গুজব ছড়ালো ‘জঙ্গি’ তকমা

আবুল কালামের পরিবার একদিকে শোকাহত, অন্যদিকে এই দুর্ঘটনার পেছনে দায় নেয়ার জন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও সংস্থা খুঁজছে। ছোট ছেলে আব্দুল্লাহ আর ছোট মেয়ে সুরাইয়া এখন বাবার অভাবকে অনুভব করতে শুরু করেছে। পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

এদিকে স্থানীয় সমাজকর্মীরা মনে করছেন, এই দুর্ঘটনা কেবল এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা নয়, বরং এটি সমগ্র নগরবাসী এবং প্রশাসনের জন্য এক সতর্কবার্তা। যেকোনো বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দায়িত্বশীল তদারকি এবং জনসাধারণের সচেতনতা অপরিহার্য।

অবশেষে, আবুল কালামের দাফন পুরো এলাকায় শোক ও বিষাদের ছায়া নেমেছে। এটি শুধু একটি ব্যক্তির পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে মনে করিয়ে দেয়, নিরাপত্তা অবহেলার মূল্য কখনোই শুধুমাত্র আর্থিক নয়। একজন মানুষ হারানোর মানসিক প্রভাব, পরিবার এবং সমাজে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা চিরকালই অনুভূত হয়।

এভাবে, মেট্রোরেলের অবহেলার কারণে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা এবং আবুল কালামের মর্মান্তিক মৃত্যু দেশের জনগণকে একটি গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে—আমাদের বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব কতটা যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত