প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর নিয়মিত কয়েকজন শিল্পী অভিযোগ করেছেন, তারা গত পাঁচ মাস ধরে অনুষ্ঠান ও নানারকম টেলিভিশন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেও সম্মানী পাননি। তাদের বরাদ্দকৃত চেকগুলো ব্যাংকে জমা দিলে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকার কারণে চেকগুলো বাউন্স হচ্ছে। অভিযোগকারীরা জানান, সোনালী ব্যাংকের রামপুরা শাখা থেকে ইস্যু করা চেকগুলোর মধ্যে অনেকের ক্ষেত্রে পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকার ক্ষুদ্র পরিমাণও নগদায়ন করা সম্ভব হয়নি।
মানবজমিনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিল্পীদের হাতে আসা পাঁচটি বাউন্স চেক যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেছে। শিল্পীরা জানান, এই পরিস্থিতি শুধু আর্থিক সমস্যাই তৈরি করছে না, বরং তাদের মানসিক চাপ ও পেশাগত কার্যক্রমেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সম্মানী না পাওয়ার কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিটিভির মাসিক সভায় এই বিষয়টি আলোচনার বিষয় হলেও সমাধান এখনো হয়নি। বিটিভি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মক অর্থ সংকটে পড়েছে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে অতিথিদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত গাড়ি চালানোও এখন সম্ভব হচ্ছে না। কর্মকর্তারা জানান, শিল্পীদের পারিশ্রমিকের বরাদ্দ অন্যান্য খাতে ব্যয় হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
অনেক কর্মকর্তা ও শিল্পী মনে করছেন, বিটিভিতে চলমান দুর্নীতি এবং অনিয়ম এই আর্থিক অস্থিরতার মূল কারণ। শিল্পীরা অভিযোগ করেছেন, বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে পরিচালিত হলে চেক বাউন্সের মতো ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, টেলিভিশন শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিটিভির সমস্যার পটভূমিতে রয়েছে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত প্রকল্পের বিলম্ব। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নতুন থার্ড টার্মিনালটি এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। জাপানের একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এই স্থাপনাটি কার্যকর হয়নি। এই প্রকল্পে রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে চলমান অচলাবস্থা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিটিভির আর্থিক সংকট শুধুমাত্র একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সমস্যা নয়। এটি দেশের সরকারি টেলিভিশন শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার সংকট এবং পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা অভাবের ফল। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পীদের সম্মানী বিলম্বিত হওয়া, চেক বাউন্স এবং অন্যান্য আর্থিক জটিলতা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।
শিল্পীরা জানান, তাদের পেশাগত জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে সম্মানী না পাওয়ায় অনেকেই ঘুরতে বাধ্য হচ্ছেন, অর্থাৎ প্রয়োজনীয় যাতায়াত ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি শিল্পীদের মানসিক চাপ বৃদ্ধি করছে এবং পেশাগত কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিটিভি কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার করে বলছেন, “আমরা চেষ্টা করছি শিল্পীদের বকেয়া অর্থ দ্রুত প্রদান করার। তবে বর্তমানে তহবিলের অভাব এবং অন্যান্য খাতে অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে। আমরা আশা করি, শীঘ্রই আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসলে শিল্পীরা তাদের সম্মানী পাবেন।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের সরকারি টেলিভিশন শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিল্পীদের সম্মানী ও অন্যান্য পারিশ্রমিক সময়মতো প্রদানের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা হলে টেলিভিশন শিল্পে পেশাগত মান এবং মানসিক নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
এছাড়া, শিল্পী ও কর্মকর্তাদের একাধিক সূত্র জানায়, সমস্যার মূল একটি কারণ হলো বাজেট বরাদ্দ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার অভাব। এ ধরনের আর্থিক অস্থিরতা শুধুমাত্র শিল্পীদের নয়, পুরো টেলিভিশন শিল্পের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে। এই পরিস্থিতিতে বিটিভি প্রশাসনকে কার্যকর ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিল্পীদের সম্মানী বিলম্ব, চেক বাউন্স এবং অন্যান্য আর্থিক সমস্যার সমাধান না হলে প্রতিষ্ঠানটি আরও সংকটে পড়তে পারে। সরকারের পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছতা ও তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হলে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব।
বর্তমানে, শিল্পী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে এক যৌথ চেষ্টার প্রয়োজন যাতে শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তা পুনরায় নিশ্চিত করা যায়। আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না হলে বিটিভির প্রথাগত অনুষ্ঠান, মানসম্মত প্রোগ্রাম সম্প্রচার এবং শিল্পীদের সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।