প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র যেন ধীরে ধীরে নিজের ক্লাব থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, চুক্তি নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মাঠে তার প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই তরুণ উইঙ্গার। গত কয়েক মাস ধরে স্প্যানিশ ও ইউরোপীয় গণমাধ্যমে গুঞ্জন চলছে, উপযুক্ত প্রস্তাব পেলে রিয়াল মাদ্রিদ তাকে বিক্রি করতে পারে। অথচ মৌসুম শেষে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে বাকি মাত্র এক বছর, কিন্তু ক্লাব কর্তৃপক্ষ এখনো নতুন কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেনি।
রবিবারের এল ক্লাসিকো যেন এই চাপ ও হতাশার চূড়ান্ত প্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। ম্যাচের ৭২ মিনিটে যখন কোচ জাবি আলোনসো তাকে বদলি করে তুললেন, তখন সম্প্রচারকারী ডাজনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক হতাশ ভিনিসিয়ুস। ঠোঁটে ক্ষোভভরা কথা—‘সব সময় আমি! আমি দল ছাড়ব! আমার চলে যাওয়াই ভালো!’—এই মুহূর্তটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে রিয়ালভক্তদের মধ্যে শুরু হয় আলোচনা, কেউ বলছেন এটি ক্ষণিকের রাগ, কেউ আবার নিশ্চিত ভিনিসিয়ুসের ভবিষ্যৎ রিয়ালে আর স্থায়ী নয়।
রিয়ালের কোচ জাবি আলোনসো অবশ্য ঘটনাটি নিয়ে শান্তভাবেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “আমি খেলার ইতিবাচক দিকগুলোতেই মনোযোগ দিই, বিশেষ করে ভিনির পারফরম্যান্সে। সে সব সময়ই দলের জন্য সর্বোচ্চটা দিতে চায়। ওর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমরা কথা বলব, কিন্তু এগুলো ফুটবলের অংশ, বিশেষ করে বড় ম্যাচে এমন আবেগ থাকা স্বাভাবিক।”
তবে ভিনিসিয়ুসের এমন প্রতিক্রিয়া যে কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং তার গভীরে জমে থাকা হতাশারই বহিঃপ্রকাশ—এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। কারণ সাম্প্রতিক সময়েই খবর এসেছে, ক্লাবের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা তার নতুন চুক্তি নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নয়। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুসের দলপতি লুকা মডরিচ, কারভাহাল, এমনকি কোর্তোয়ার সঙ্গেও নতুন চুক্তি বা পুনর্নবায়ন নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। এতে তার মধ্যে অনিশ্চয়তার ছায়া আরও গভীর হচ্ছে।
এদিকে একই ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের আরেক দুঃসংবাদ এসেছে অধিনায়ক দানি কারভাহালের ইনজুরি নিয়ে। দলের ডান দিকের এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারকে ডান হাঁটুর অস্ত্রোপচার করতে হবে, যা তাকে বছরের বাকি সময়ের জন্য মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারে। ৩৩ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ তারকা চলতি মৌসুমে লা লিগার ১০ ম্যাচে সাতটিতে খেলেছেন। এল ক্লাসিকোতেও তিনি দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন।
রিয়ালের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমাদের অধিনায়ক দানি কারভাহালের ডান হাঁটুতে একটি লুজ বডি শনাক্ত হয়েছে। তাকে দ্রুত আথ্রোস্কোপিক অস্ত্রোপচার করানো হবে।” গত বছরও একই হাঁটুতে লিগামেন্ট ও টেনডন ছিঁড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন কারভাহাল। এবারও হয়তো তাকে একই ধরণের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
রিয়ালের এই দুঃসময় যেন আরও জটিল করে তুলছে দলের ভেতরের পরিবেশকে। অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ের পর পর ইনজুরি, বেঞ্চে রদবদল, আর পারফরম্যান্সের ওঠানামা দলের ভেতরে একটা অস্থিরতা তৈরি করছে। ভিনিসিয়ুসের মতো তারকারা যেখানে দলের ভবিষ্যতের প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে তাদের হতাশা বা দল ছাড়ার ইঙ্গিত ক্লাবের জন্য ভালো বার্তা নয়।
স্প্যানিশ গণমাধ্যম ‘মার্কা’ ও ‘আস’-এর বিশ্লেষণ বলছে, ভিনিসিয়ুসের এই ক্ষোভ মূলত মানসিক চাপের ফল। তিনি মনে করছেন, তাকে যথাযথ সম্মান ও নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। নতুন তারকাদের আগমন, বিশেষ করে কিলিয়ান এমবাপ্পের আসন্ন অন্তর্ভুক্তি, হয়তো তার অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এমবাপ্পে যদি আগামী মৌসুমে রিয়ালে যোগ দেন, তাহলে বাম উইংয়ে ভিনিসিয়ুসের জায়গা নিয়ে তৈরি হবে সরাসরি প্রতিযোগিতা।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ধারণা করছেন, ভিনিসিয়ুস হয়তো পিএসজি বা ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবে নতুন সূচনা করতে পারেন। পিএসজি ইতোমধ্যেই তার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও বিষয়টি এখনো অনানুষ্ঠানিক। অন্যদিকে রিয়ালের ভেতরকার সূত্র বলছে, ক্লাব চাইলে চুক্তি নবায়নের প্রস্তাব দিতে পারে, তবে তা অনেকাংশে নির্ভর করছে মৌসুম শেষে তার পারফরম্যান্স ও দলের সামগ্রিক অবস্থার ওপর।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ২০১৮ সালে ব্রাজিলের ফ্ল্যামেঙ্গো থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেন। তারপর থেকে ধীরে ধীরে তিনি ক্লাবের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উইঙ্গারে পরিণত হন। রিয়ালের হয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট দিয়ে দলকে জিতিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে লিভারপুলের বিপক্ষে তার একমাত্র গোলেই ট্রফি জেতে রিয়াল। সেই ভিনিসিয়ুস যদি আজ ক্লাব ছাড়ার কথা বলেন, তবে তা কেবল রিয়াল মাদ্রিদের জন্য নয়, বরং ফুটবল বিশ্বের জন্যই বড় খবর।
এখন প্রশ্ন একটাই—এটি কি কেবল এক মুহূর্তের ক্ষোভ, নাকি সত্যিই বিদায়ের পূর্বাভাস? রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকরা তাই আপাতত অপেক্ষায় আছেন ক্লাবের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার জন্য, আর ভিনিসিয়ুসের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন ইউরোপের ফুটবল অঙ্গন জুড়েই চলছে উত্তেজনা ও জল্পনা।