‘রাশিয়া যদি হামলা করে, মানচিত্র থেকেই মুছে ফেলা হবে’—বেলজিয়ামের হুঁশিয়ারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬২ বার
‘রাশিয়া যদি হামলা করে, মানচিত্র থেকেই মুছে ফেলা হবে’—বেলজিয়ামের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ · একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইউরোপজুড়ে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়াকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেন। সম্প্রতি ব্রাসেলসে দেশটির জাতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাশিয়া যদি ইউরোপের কেন্দ্রস্থল বেলজিয়ামে কিংবা ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রে হামলা চালায়, তবে তার জবাব হবে ভয়াবহ। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা, ইউরোপের প্রতিরক্ষা ঘাটতি এবং ন্যাটোর ঐক্য নিয়ে নতুন করে ভাবনার আহ্বান।

বেলজিয়াম দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। ইউরোপ এখন এক অজানা বাস্তবতার মুখোমুখি—যেখানে প্রতিরক্ষা জোটের ঐক্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং যুদ্ধপ্রস্তুতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

ফ্রাঙ্কেন বলেন, “রাশিয়ার সামরিক ক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। তারা এখন এমন এক যুদ্ধ অর্থনীতি তৈরি করেছে, যা ন্যাটোর সম্মিলিত গোলাবারুদের চেয়ে চারগুণ বেশি অস্ত্র উৎপাদন করছে। ইউরোপে এখনো কোনো কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড নেই, যা আমাদের দুর্বলতার মূল উৎস।” তাঁর মতে, ইউরোপীয় দেশগুলো যদি নিজেদের প্রতিরক্ষা সমন্বিতভাবে না গড়ে তোলে, তবে ভবিষ্যতে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।

তবে বেলজিয়ান মন্ত্রী রাশিয়ার সক্ষমতাকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমরা যদি কোনো রকম হামলার শিকার হই—তা ব্রাসেলস হোক বা অন্য কোনো শহরে—তবে রাশিয়াকে বুঝতে হবে, তার জবাব আমরা দেব। আমাদের জবাব এতটাই কঠোর হবে যে, মস্কোর জন্য তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।” তাঁর এই মন্তব্যে ইউরোপজুড়ে কূটনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি ছিল এক ধরনের কৌশলগত বার্তা, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তার দুর্বল জায়গাগুলো শক্ত করার আহ্বানও বটে।

ভারতে পালানোর পথে ‘আজিজুল ইসলাম আজিজ’ : শামীম ওসমানের সহযোগী গ্রেপ্তার

ফ্রাঙ্কেন আরও বলেন, “পুতিন জানেন, ন্যাটো একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করতে আমরা প্রস্তুত।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, “ন্যাটোর প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি আজও অটুট। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের পাশে থাকবে। তাদের ছাড়া আমরা টিকে থাকতে পারব না।”

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বই নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা। তবে একইসঙ্গে তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

ফ্রাঙ্কেন বলেন, “ইউরোপ এখন জেগে উঠেছে। আমরা জানি, আমাদের নিজেদের রক্ষা করার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।” তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি একীভূত প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরিরও আহ্বান জানান, যা ভবিষ্যতে রাশিয়া বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় হুমকির মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার এই পর্যায়ে ইউক্রেনের যুদ্ধও তাঁর আলোচনায় স্থান পায়। ফ্রাঙ্কেন বলেন, “রাশিয়া শুধু ইউক্রেনের সঙ্গে লড়ছে না, তারা পুরো পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ইউক্রেনীয় সেনারা আজ যে লড়াই করছে, তা কেবল তাদের নয়—আমাদের অস্তিত্ব রক্ষারও লড়াই। আমাদের দেওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অর্থ না পেলে ইউক্রেন অনেক আগেই পরাজিত হতো।”

এই মন্তব্যের মাধ্যমে বেলজিয়াম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, তারা ইউক্রেনের পক্ষে অবস্থান অব্যাহত রাখবে। তবে মন্ত্রী এটাও স্বীকার করেছেন যে, ইউরোপের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা এখনো সীমিত। “আমাদের সামরিক শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে হবে,” তিনি বলেন। “রাশিয়া যেভাবে যুদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, আমরা সেই পর্যায়ে এখনো পৌঁছাতে পারিনি। ন্যাটোর ঐক্য ধরে রাখতে হলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে যৌথ উদ্যোগে অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে হবে।”

এদিকে রাশিয়ার দিক থেকেও বেলজিয়ামের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া তীব্র হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা করছে। মস্কো দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে ব্যবহার করছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ চালানোর জন্য। বেলজিয়ামের মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি সেই দাবিকে আরও উস্কে দিতে পারে। রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইতোমধ্যে মন্তব্য করেছে, “বেলজিয়ামের এই বক্তব্য ইউরোপে উত্তেজনা বাড়াবে এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

তবে বেলজিয়ামের অবস্থান দৃঢ়। সরকারিভাবে দেশটি জানিয়েছে, তারা কোনো সংঘাত চায় না, কিন্তু আত্মরক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেবে না। ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দফতর থাকায় বেলজিয়াম কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কোনো হামলা বা হুমকি মানে পুরো ইউরোপের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে—এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন মন্ত্রী।

একই সময়ে বেলজিয়াম নেদারল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নেও কাজ করছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ইউরোপীয় আকাশসীমায় রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল হুমকি মোকাবিলা করা। ফ্রাঙ্কেন বলেন, “ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা নীতিকে আধুনিকায়ন করতে না পারলে আগামী দশকে আমরা আরও বড় বিপদের মুখে পড়ব।”

তাঁর মতে, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। তিনি বলেন, “রাশিয়া বুঝে ফেলেছে—পশ্চিম একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। আমাদেরও বুঝতে হবে, ঐক্যই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র।”

ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বেলজিয়ামের এই অবস্থান ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি এবং পোল্যান্ড ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রাঙ্কেনের বক্তব্য ছিল “রাশিয়ার প্রতি কড়া বার্তা, তবে ন্যাটোর ভেতর ঐক্যের জন্যও এক ধরণের প্রণোদনা।”

মস্কো থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, রুশ কূটনৈতিক মহলে বেলজিয়ামের মন্তব্যকে ‘উসকানিমূলক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোর সম্প্রসারণকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে দাবি করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে বেলজিয়ামের কঠোর সুর সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাতে পারে।

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি সামিরা ও ডনের খোঁজ মিলছে না

তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর একাংশ মনে করে, এখন শক্ত অবস্থান না নিলে ভবিষ্যতে আরও বিপদে পড়তে হবে। ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং রুশ প্রভাবের বিস্তারের পর ইউরোপের সামনে প্রতিরক্ষা-ঐক্যই একমাত্র পথ।

বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেনের বক্তব্য তাই শুধু এক রাজনৈতিক বিবৃতি নয়; এটি এক প্রতীকী ঘোষণা, যা ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাশিয়ার প্রতি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আসলে পশ্চিমা জোটকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিচ্ছেন—যাতে কোনো আগ্রাসন, হুমকি বা যুদ্ধ আবার ইউরোপের শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করতে না পারে।

এখন প্রশ্ন একটাই—রাশিয়া এই হুঁশিয়ারিকে কীভাবে গ্রহণ করবে? প্রতিক্রিয়া যদি কঠোর হয়, তাহলে ইউরোপের নিরাপত্তা রাজনীতি আরও জটিল হতে পারে। কিন্তু ফ্রাঙ্কেনের বিশ্বাস স্পষ্ট—যে কোনো মূল্যে ইউরোপকে রক্ষা করাই এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত