প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সরকারি চাকরির অপেক্ষায় থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সুখবর এনেছে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি এবং এর অধীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় ও বরিশাল সার্কিট হাউসে ২০তম গ্রেডভুক্ত মোট ৮৩টি শূন্য পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি ইতোমধ্যে সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন হবে এবং কোনোভাবেই সরাসরি বা ডাকযোগে আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বরিশাল বিভাগের কর্মসংস্থানের বাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে, কারণ এই পদগুলোতে শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীরাও আবেদন করতে পারবেন। অনেক তরুণ, বিশেষ করে এসএসসি বা জেএসসি পাস শিক্ষার্থীরা এখন সরকারি চাকরির সুযোগের আশায় এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে এক সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ সকাল ১০টা থেকে এবং শেষ হবে ২৯ নভেম্বর বিকেল ৫টায়। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আবেদন ফি হিসেবে ৫০ টাকা ও টেলিটক সার্ভিস চার্জ বাবদ ৬ টাকা—মোট ৫৬ টাকা টেলিটকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফি পরিশোধ না করলে আবেদনটি বাতিল বলে গণ্য হবে।
বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, মোট ৮৩টি শূন্য পদের মধ্যে রয়েছে অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, মালি, বেয়ারার, বাবুর্চি এবং সার্কিট হাউসের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরী পদ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পদ রয়েছে অফিস সহায়ক ও নিরাপত্তা প্রহরী পদে।
অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ হবে ৩৩ জন। আবেদনকারীদের ন্যূনতম মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এই পদটি বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কার্যালয়ে বিতরণ করা হবে। অফিস সহায়কদের দায়িত্ব সাধারণত অফিসিয়াল নথিপত্র বহন, ফাইল সাজানো, কর্মকর্তাদের সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন করা।
নিরাপত্তা প্রহরী পদে মোট ২৬টি শূন্যস্থান রয়েছে। এই পদের জন্যও ন্যূনতম যোগ্যতা এসএসসি পাস। প্রার্থীদের শারীরিকভাবে সুস্থ এবং কর্মক্ষম হতে হবে, কারণ তাদের দায়িত্ব হবে সরকারি ভবন ও স্থাপনার নিরাপত্তা রক্ষা করা, অতিথিদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা এবং যে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধ করা।
পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে নিয়োগ দেওয়া হবে ১৬ জনকে। এই পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে ন্যূনতম জেএসসি বা সমমান। এই নিয়োগের একটি বিশেষ দিক হলো—এই পদগুলোর ৮০ শতাংশ জাত হরিজন সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। তবে নির্ধারিত কোটা পূরণ না হলে সাধারণ প্রার্থীদের মধ্য থেকেও নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ‘সমতা ও অন্তর্ভুক্তি’ নীতির অংশ হিসেবেই এই সংরক্ষণ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া বাগান ও ফুলের যত্ন নেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে একজন মালি। এই পদটির জন্যও জেএসসি পাস শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ভবনের সৌন্দর্য রক্ষায় এবং বাগান পরিচর্যায় এই পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বরিশাল সার্কিট হাউসে বিশেষভাবে তিনজন বেয়ারার, একজন বাবুর্চি এবং তিনজন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ দেওয়া হবে। সার্কিট হাউসের বেয়ারারদের মূল দায়িত্ব হবে অতিথিদের খাবার পরিবেশন, কক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ভিআইপি অতিথিদের সহায়তা করা। বাবুর্চি পদে আবেদনকারীদের ন্যূনতম জেএসসি পাসের পাশাপাশি রান্নার কাজে অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সরকারি অতিথিশালা ও ভিআইপি আবাসনের খাবারের মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে অভিজ্ঞ বাবুর্চি নিয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব পদই ২০তম গ্রেডভুক্ত, যেখানে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৮,২৫০ থেকে ২০,০১০ টাকা পর্যন্ত। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত অন্যান্য ভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পেনশন সুবিধা এবং চাকরির স্থায়িত্বও থাকবে। বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ৩২ বছর পর্যন্ত। তবে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, নারী ও প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত বয়সসীমা শিথিলতার নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
বরিশাল জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। কোনো ধরনের দালালচক্র বা ঘুষের আশ্রয় নিয়ে চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়। আবেদনকারীরা যেন অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের নির্দেশনা মেনে অনলাইনে আবেদন করেন, সেটিই আমাদের অনুরোধ।”
এদিকে চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি শেয়ার করে মন্তব্য করছেন, “সরকারি চাকরির স্বপ্ন এখন আরও বাস্তব মনে হচ্ছে।” বরিশাল অঞ্চলের যুবসমাজের বড় অংশই এখন সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরির আশায় আবেদন প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
স্থানীয় কর্মসংস্থান বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরিশাল অঞ্চলে সরকারি চাকরির নিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও উপজেলা পর্যায়ে একসঙ্গে এত সংখ্যক পদে নিয়োগের ঘটনা বিরল। এটি স্থানীয় তরুণদের জন্য একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তারা আরও বলেন, “এ ধরনের পদগুলো মূলত নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসা তরুণদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব পদে নিয়োগ পেলে চাকরির স্থায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদাও বেড়ে যায়।”
আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেলা প্রশাসকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। আবেদনকারীদেরকে ফর্ম পূরণের সময় ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ছবি এবং স্বাক্ষর সঠিকভাবে আপলোড করতে হবে। আবেদনপত্রে ভুল তথ্য দিলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। পরীক্ষার সময়সূচি ও কেন্দ্রের নাম আবেদনকারীর মোবাইল নম্বরে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। পরীক্ষার ফলাফল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
সরকারি চাকরির প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন এবং অবসরোত্তর সুবিধা অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিই এখন হাজারো আবেদনকারীর ভিড়ে রূপ নেয়। বরিশালের এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটিও তার ব্যতিক্রম নয়—অনেকেই ইতিমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন।
তবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আবেদনকারীদের সতর্ক করেছেন, যেন কোনো প্রতারক বা ভুয়া নিয়োগ এজেন্টের ফাঁদে না পড়েন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “এই নিয়োগ সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয়। কেউ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে, সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকে জানান।”
বরিশালের এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রমাণ করে, সরকারি প্রশাসন এখন শুধু দক্ষ কর্মকর্তাদের নয়, নিম্নপদস্থ কর্মচারী পর্যায়েও নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করতে আগ্রহী। প্রশাসনের দাবি, স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রেখে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় এমন সরকারি চাকরির সুযোগ অনেক পরিবারে নতুন আশার আলো জ্বালাচ্ছে। এসএসসি বা জেএসসি পাস তরুণদের জন্য এ নিয়োগ হতে পারে জীবনের প্রথম সরকারি পদক্ষেপ, যা একদিকে কর্মসংস্থান বাড়াবে, অন্যদিকে বরিশাল অঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নতুন গতি যোগ করবে।
সবশেষে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় জানিয়েছে, “এই নিয়োগের লক্ষ্য শুধুমাত্র শূন্য পদ পূরণ নয়, বরং একটি দক্ষ, দায়িত্বশীল ও সেবামুখী প্রশাসনিক টিম গড়ে তোলা।” ফলে আবেদনকারীদের শুধু যোগ্যতা নয়, দায়িত্ববোধ, সততা ও নিষ্ঠা দিয়েও নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।