স্লোগান মুখোমুখি -শিবিরের শুভেচ্ছা, ছাত্রদলের আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩১ বার
স্লোগান মুখোমুখি -শিবিরের শুভেচ্ছা, ছাত্রদলের আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের নীরব রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে ছাত্র রাজনীতির দুই ঐতিহ্যবাহী সংগঠন — বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির। একদিকে, ছাত্রদলের নতুন শাখা কমিটি গঠনের পর শুভেচ্ছা জানিয়েছে ছাত্রশিবির, অন্যদিকে সেই শুভেচ্ছার বিপরীতে ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির আনন্দ মিছিল থেকে শিবিরকে কেন্দ্র করে আক্রমণাত্মক স্লোগান দেওয়া হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক সমাজ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে অস্বস্তি ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাসির সোমবার নোবিপ্রবি শাখার ৬০ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন। এতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান কৃষি বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী হাবিবুল হাসান হাসিব।

কমিটি ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শুভেচ্ছা বার্তা আসতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রশিবিরের এক অভিনন্দন বার্তা। নোবিপ্রবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি আরিফুল ইসলাম ও সেক্রেটারি আরিফুর রহমান সৈকতের স্বাক্ষরিত বার্তায় বলা হয়, “ছাত্রদল নোবিপ্রবি শাখার নবগঠিত কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ প্রত্যেক সদস্যকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা প্রত্যাশা করি, নতুন কমিটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”

এই শুভেচ্ছা বার্তাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেললেও কিছু সময়ের মধ্যেই ঘটনাটি অন্যরূপ নেয়। দুপুরের দিকে নতুন কমিটির নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে আনন্দ মিছিল বের করেন। মিছিল চলাকালীন কিছু ছাত্রদল কর্মীকে দেখা যায় আক্রমণাত্মক ও উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান দিতে। স্লোগানে বলা হয়— “বট বাহিনীর ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না”, “গুপ্তদের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না।” এসব স্লোগান সরাসরি ইসলামী ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভারতে পালানোর পথে ‘আজিজুল ইসলাম আজিজ’ : শামীম ওসমানের সহযোগী গ্রেপ্তার

মিছিলে অংশ নেওয়া ছাত্রদলের কয়েকজন নবনির্বাচিত সদস্য জানান, তাদের এই স্লোগান কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনকে আক্রমণ করে নয়, বরং ক্যাম্পাসে “গুপ্ত রাজনীতি”র বিরুদ্ধে। তারা দাবি করেন, নোবিপ্রবিতে বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠন গোপনে সক্রিয় থেকে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য হুমকি।

নোবিপ্রবি ছাত্রদলের নবনির্বাচিত সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা সব সময় উন্মুক্ত রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। এখানে কোনো গুপ্ত রাজনীতি হতে পারে না। যারা নিজেদের পরিচয় গোপন করে রাজনীতি করতে চায়, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছে। ছাত্রদের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা চাই— সবাই নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে কাজ করুক। ক্যাম্পাসে কেউ যদি গোপনে কোনো সংগঠনের নামে কাজ করে, সেটা মেনে নেওয়া হবে না।”

তার মতে, ছাত্রদলের উদ্দেশ্য কোনো সংঘাত নয়, বরং ‘স্বচ্ছ রাজনীতির’ প্রচলন। তবে মিছিলের স্লোগান যে বিষয়টিকে বিতর্কিত করে তুলেছে, তা তিনি স্বীকার করেন। “মিছিলের আবেগে কিছু স্লোগান উঠে এসেছে, কিন্তু আমাদের মূল উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বচ্ছ রাজনীতি নিশ্চিত করা,” যোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে, নোবিপ্রবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি আরিফুল ইসলাম এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরাও তাদের মিছিলের স্লোগান শুনেছি। তবে তারা সরাসরি আমাদের সংগঠনের নাম নেয়নি। তাই আমরা বিষয়টি নিয়ে কোনো বিরোধ সৃষ্টি করতে চাই না। আমরা সব সময় ইতিবাচক শিক্ষাঙ্গন চেয়েছি, এবং সেই অনুযায়ী কাজ করছি।”

তিনি আরও বলেন, “ছাত্রদল বলছে আমরা গুপ্ত রাজনীতি করি, কিন্তু আমরা গত এক বছরে অন্তত তিনটি প্রকাশ্য আয়োজন করেছি— নবীনবরণ, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাভিত্তিক ট্যুর, এবং সামাজিক কর্মসূচি। এগুলো সবার চোখের সামনে হয়েছে এবং আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও সেগুলোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আমরা গোপনে নয়, প্রকাশ্যে কাজ করছি। বরং যারা অজুহাত তৈরি করছে, তাদের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকে এই ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, নোবিপ্রবি দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক শান্ত ছিল। এখন রাজনৈতিক উত্তেজনা ফের ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। একজন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা চাই না ক্যাম্পাস আবার রাজনৈতিক সহিংসতার মাঠে পরিণত হোক। যে শুভেচ্ছা থেকে সম্পর্কের সূচনা হতে পারত, সেখানে আবার সংঘাতের বার্তা এসেছে, এটা হতাশাজনক।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন সংগঠনের অনানুষ্ঠানিক উপস্থিতি থেকে যায়। আমরা চাই না এই ঘটনাটি বড় কোনো সংঘর্ষে রূপ নিক। তাই উভয় পক্ষের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।”

নোবিপ্রবির এক শিক্ষক মন্তব্য করেন, “এ ধরনের ঘটনার মধ্যে মূল সমস্যা হলো সহনশীলতার অভাব। ছাত্র রাজনীতির উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে তোলা, কিন্তু আমরা এখন দেখছি তা অনেক সময় প্রতিপক্ষকে হেয় করার মাধ্যম হয়ে যাচ্ছে। যে শুভেচ্ছা বার্তা সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারত, তা পরিণত হলো অবিশ্বাসের বার্তায়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের মূল দলীয় অবস্থান প্রতিফলিত করছে। ফলে ক্যাম্পাস রাজনীতির প্রতিটি ঘটনাই জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে কোনো সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির সূচনা ছাত্র সংগঠন থেকেই হয়েছে বলে তাদের দাবি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাজনীতির রূপ বদলে গেছে। একদিকে প্রকাশ্য শুভেচ্ছা বা বিবৃতি রাজনীতির নরম চেহারা উপস্থাপন করে, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে দেখা যায় তার উল্টো প্রতিক্রিয়া। এ ধরনের দ্বৈত অবস্থান রাজনীতিকে বিভক্ত ও অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়।

নোবিপ্রবি প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে কেউ উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান বা আক্রমণাত্মক আচরণে জড়িয়ে না পড়ে। একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে যদি কোনো পক্ষ আইন লঙ্ঘন করে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে বলেও জানানো হয়েছে।

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি সামিরা ও ডনের খোঁজ মিলছে না

এ ঘটনার পর শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক সহনশীলতা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? একদিকে ছাত্র রাজনীতি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হওয়ার কথা, অন্যদিকে সেটিই যেন পরিণত হচ্ছে বিভাজন ও উত্তেজনার অঙ্গনে। নোবিপ্রবির ঘটনাটি হয়তো আপাতত ক্ষুদ্র মনে হলেও, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতির অন্তর্নিহিত সংকটের প্রতিচ্ছবি — যেখানে সৌহার্দ্যের বার্তা মুহূর্তেই আক্রমণাত্মক স্লোগানের মধ্যে হারিয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে নোবিপ্রবি প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলো যদি সংলাপের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে পারে, তবে সেটি ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত হতে পারে। অন্যথায়, একটি শুভেচ্ছাবার্তা থেকে শুরু হওয়া এই সূক্ষ্ম সংঘাত হয়তো ভবিষ্যতের বড় রাজনৈতিক উত্তেজনার বীজ বপন করে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত