দুদকের উদ্যোগে এস আলমের শত শত একর জমি জব্দ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১৯ বার
দুদকের উদ্যোগে এস আলমের শত শত একর জমি জব্দ

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

আলোচিত শিল্পগ্রুপ এস আলমের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন।

দুদকের আবেদনে জানানো হয়, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার পরিবারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে কমিশন। অনুসন্ধান চলাকালে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, সাইফুল আলম ও তার ঘনিষ্ঠজনেরা দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নামে বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন, যা বিধি-বহির্ভূতভাবে আত্মসাৎ করে ব্যক্তি ও পারিবারিক নামে সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে।

শুনানি শেষে আদালত দুদকের আবেদনে সাড়া দিয়ে গাজীপুর ও কক্সবাজার জেলায় মোট ১৪২২ বিঘা (প্রায় ৪৭৫ একর) জমি জব্দের নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশে গাজীপুর সদরে ৮ দশমিক ৫৮ একর, শ্রীপুরে ৪ দশমিক ৮৬ একর, কক্সবাজারের পেকুয়ায় ২৭২ দশমিক ৬৮ একর, মহেশখালীতে ১৮০ দশমিক ২৮২১ একর, কক্সবাজার সদরে ২ দশমিক ১২ একর এবং চকরিয়া সদরে ০ দশমিক ৯৬৭৫ একর জমি জব্দ করা হয়। এসব সম্পত্তি সাইফুল আলম, তার পরিবারের সদস্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে রয়েছে বলে দুদক জানায়।

ভারতে পালানোর পথে ‘আজিজুল ইসলাম আজিজ’ : শামীম ওসমানের সহযোগী গ্রেপ্তার

দুদকের উপপরিচালক তাহাসিন মুনাবীল হক আদালতে আবেদনের মাধ্যমে জানান, চলমান অনুসন্ধানে একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার নিকটজনরা নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। সেই সঙ্গে দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে জমি, বাড়ি ও শিল্প-কারখানার মালিকানা অর্জন করেছেন, যা তাদের ঘোষিত আয়-উৎসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

দুদকের মতে, এই সম্পদসমূহ অবৈধ অর্থে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে এবং অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে সেগুলো অন্যত্র হস্তান্তরের আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই সম্পদসমূহ দ্রুত জব্দ করা না হলে সেগুলো উদ্ধার করা কঠিন হবে। আদালত আবেদনটি পর্যালোচনা করে জরুরি ভিত্তিতে জব্দের নির্দেশ দেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশ বাংলাদেশের করপোরেট জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করবে, বিশেষ করে যখন ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। তারা মনে করছেন, যদি অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ করপোরেট দুর্নীতির মামলায় পরিণত হতে পারে।

এস আলম গ্রুপ বাংলাদেশের একটি বহুমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান, যা ব্যাংকিং, ইস্পাত, চিনি, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি-রফতানি, এবং রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক মালিকানা ও ঋণসংক্রান্ত নানা বিতর্কে জড়িয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে বিপুল ঋণ গ্রহণ এবং তা পুনঃঅর্থায়নের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এস আলম গ্রুপের মতো বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তারা সতর্ক করেছেন, অনুসন্ধানটি যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়, বরং স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

অন্যদিকে, এস আলম গ্রুপের কোনো কর্মকর্তা এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, দুদকের অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণে গ্রুপটিকে টার্গেট করা হচ্ছে। সূত্রটি দাবি করে, “এস আলম গ্রুপ সব সময় দেশের আইন ও নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। আদালতের আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাইফুল আলম ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার এবং দেশে অনিয়মিত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে। প্রয়োজন হলে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিদেশি বিনিয়োগের তথ্যও যাচাই করা হবে।

কক্সবাজার ও গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর স্থানীয় ভূমি অফিস ও প্রশাসন একযোগে জব্দকৃত সম্পদগুলোর দখল কার্যক্রম শুরু করবে। প্রাথমিকভাবে এসব জমির সীমানা চিহ্নিত করে রেকর্ড সংরক্ষণ করা হবে, যাতে কোনো প্রকার হস্তান্তর বা বিক্রয় বন্ধ থাকে।

আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলাটি বাংলাদেশের করপোরেট খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধের নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ ঘোষণার স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

বিভিন্ন আর্থিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এস আলম গ্রুপের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন আইনি পদক্ষেপ ব্যবসায়িক জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে এটি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে এটি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি সামিরা ও ডনের খোঁজ মিলছে না

দুদক জানিয়েছে, অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত জব্দকৃত জমিগুলো আদালতের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না। চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার পরই জানা যাবে, এসব সম্পদ আসলে বৈধ নাকি অবৈধ উপায়ে অর্জিত।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে এস আলম গ্রুপের প্রভাব এবং সাম্প্রতিক এই আদালতের আদেশ নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়—বরং দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত