আরও কমল স্বর্ণের দাম, নতুন দামে স্বস্তি বাজারে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪০ বার
দেশে স্বর্ণের বাজারে নতুন দামের পরিসংখ্যান

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম। টানা কয়েক দফা বাড়ার পর এবার বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ঘোষণা করেছে নতুন দামের তালিকা। মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) রাতে সংগঠনটির পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভরিতে ১০ হাজার ৪৭৪ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮০৯ টাকা।

বুধবার (২৯ অক্টোবর) থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন দামের সিদ্ধান্তে স্বর্ণ বাজারে নেমেছে এক ধরনের স্বস্তি। গত কয়েক মাস ধরে টানা মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্রেতারা যেমন বিপাকে ছিলেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বেচাকেনায় এক ধরনের স্থবিরতা দেখছিলেন। ফলে এই দাম কমানো বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দামে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও বিশ্ববাজারের মূল্য বিবেচনায় দেশের অভ্যন্তরে স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন দামের তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮০৯ টাকা, ২১ ক্যারেটের ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের এক ভরি দাম ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজুসের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, স্বর্ণের নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে সরকার-নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করতে হবে। তবে গহনার নকশা ও মানভেদে মজুরিতে পার্থক্য থাকতে পারে।

এর আগে ২৭ অক্টোবর বাজুস সর্বশেষ স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল। সেদিন ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৪ হাজার ২৮৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়, অর্থাৎ মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দাম কমল ১০ হাজার টাকারও বেশি। ২১ ক্যারেটের দাম ছিল ১ লাখ ৯৪ হাজার ৯৯৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৪৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯৪২ টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম এখন তুলনামূলক অস্থির অবস্থায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মুদ্রানীতি কঠোর হওয়ার প্রভাব এবং চীনা অর্থনীতির মন্থরতা মিলিয়ে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ওঠানামা করছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের বাইরে নয়।

বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশের বাজারে ৭০ বার সমন্বয় করা হয়েছে স্বর্ণের দাম। এর মধ্যে ৪৮ বার দাম বেড়েছে এবং মাত্র ২২ বার কমেছে। গত বছর ২০২৪ সালে মোট ৬২ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৫ বার বেড়েছিল এবং ২৭ বার কমেছিল। এই ঘন ঘন দামের ওঠানামা বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মার্কেটের জুয়েলারি দোকান মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, “দাম এত দ্রুত ওঠানামা করছে যে ক্রেতারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আজকে যারা কিনতে আসছেন, কাল দাম আবার পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এখন দাম কমায় হয়তো বিক্রি কিছুটা বাড়বে।”

অন্যদিকে, ক্রেতাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে স্বস্তির হাসি। গুলশানের বাসিন্দা মেহজাবিন আক্তার বলেন, “অনেকদিন ধরেই বিয়ের গহনা কেনার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু দাম এত বেশি ছিল যে সাহস পাইনি। এখন দাম কিছুটা কমায় হয়তো গহনা কেনা সম্ভব হবে।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক নীতি—এসব বিষয় স্বর্ণের দামের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানির জন্য ডলার সংকট এবং শুল্ক কাঠামোর প্রভাবও দামের ওঠানামায় ভূমিকা রাখছে।

একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম যেভাবে পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে আগামী মাসগুলোতে আবারও দাম বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই ক্রেতাদের ‘স্মার্ট সিদ্ধান্ত’ নিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও চোখ রাখছে বাজুস। তবে এবার রুপার দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ২৪৬ টাকায়, ২১ ক্যারেটের ৪ হাজার ৪৭ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৩ হাজার ৪৭৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ২ হাজার ৬০১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বর্ণের দামে সাময়িক এই পতন সাধারণ জনগণের জন্য ইতিবাচক হলেও বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাজুস ও সরকারের যৌথ পদক্ষেপ জরুরি। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষ যেন বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের একটি নির্ভরযোগ্য ক্ষেত্র হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আস্থা রাখতে পারে, সেটিই এখন সময়ের দাবি।

স্বর্ণ কেবল অলঙ্কার নয়, এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিয়ে থেকে শুরু করে উৎসব—সব ক্ষেত্রেই এর উপস্থিতি অপরিহার্য। তাই দাম ওঠানামা সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাজারে এই সাময়িক স্বস্তি টিকবে কতদিন, তা এখন সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত