প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের টি-টোয়েন্টি সংস্করণে একসময় সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিলেন তরুণ বাঁহাতি ব্যাটার শামীম হোসেন পাটোয়ারী। বিপিএলে চিটাগং কিংসের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে আলোচনায় আসা এই ক্রিকেটারকে একসময় ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবেই দেখা হয়েছিল। বিশেষ করে জাকের আলীর সঙ্গে তাঁর অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশ দলের লোয়ার অর্ডারে এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উজ্জ্বলতা হারাতে শুরু করেছেন শামীম। প্রত্যাবর্তনের পর দারুণ শুরু করলেও এখন তিনি ব্যাট হাতে একেবারেই ব্যর্থ, এমনকি অধিনায়ক লিটন দাস পর্যন্ত তাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রকাশ্যে হতাশা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন।
চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে দলের পরাজয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে লিটন দাস বলেন, “শামীমের ব্যাটিং নিয়ে আমি আশাহত। তাঁর উচিত ছিল পরিস্থিতি বুঝে খেলা। আপনি সবসময় ব্যাটিং উপভোগ করতে পারবেন না, কখনও কখনও দলের প্রয়োজনে দায়িত্ব নিতে হয়।” এই বক্তব্যের পর থেকেই ক্রিকেট মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা—অধিনায়ক হিসেবে প্রকাশ্যে একজন সতীর্থকে এভাবে সমালোচনা করা কতটা উপযুক্ত ছিল, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে।
তবে লিটনের হতাশার পেছনে যুক্তিও আছে। চলতি বছরে শামীম ২৩টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন, যেখানে ২০ ইনিংসে ১২২ স্ট্রাইক রেটে করেছেন মাত্র ২৬০ রান। প্রথম দেখায় স্ট্রাইক রেট হয়তো খারাপ মনে না হলেও বাস্তবে তাঁর রানগুলো এসেছে অনিয়মিত ও অনর্থক সময়ে। দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন দায়িত্ব নিতে। বিশেষ করে প্রথম ম্যাচে যখন তিন উইকেট পড়েছে মাত্র ৩৮ রানে, তখন শামীমের দায়িত্ব ছিল ইনিংসকে স্থিতিশীল করা। কিন্তু তিনি বরং অনর্থক এক আক্রমণাত্মক শট খেলে ফিরে যান প্যাভিলিয়নে, যা অধিনায়কের হতাশার অন্যতম কারণ।
শেষ ২০ ইনিংসের মধ্যে ১১ ইনিংসেই শামীম আউট হয়েছেন এক অঙ্কের স্কোরে, যার মধ্যে তিনবার শূন্য। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় তাঁর ফর্ম কতটা নিচে নেমে গেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এক ম্যাচে পুল খেলার মতো বল না থাকলেও সেই শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হন তিনি। তার আগের সিরিজে আফগানিস্তানের বিপক্ষে মুজিব উর রহমানের করা এক ডেলিভারিতে উইকেট থেকে বেরিয়ে এসে বড় শট খেলার চেষ্টা করে একইভাবে বোল্ড হন। বারবার একই ভুলে আউট হওয়ার এই প্রবণতা কেবল তাঁর টেকনিক নয়, মানসিক প্রস্তুতির ঘাটতিও প্রকাশ করে।
ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল মনে করেন, শামীমের ব্যর্থতার মূল কারণ তাঁর ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা। তাঁর ভাষায়, “শামীম মূলত একজন ফিনিশার। তাকে যদি ম্যাচের আগের দিকে ব্যাট করতে পাঠানো হয়, সেটা বাড়তি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই চাপ সামলাতে না পেরে সে নিজের খেলাটা হারিয়ে ফেলে।” আশরাফুল আরও বলেন, “শামীম অনেকটা গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের স্টাইলের খেলোয়াড়। সে ধারাবাহিকভাবে ১০-১১ ম্যাচ ভালো খেলতে পারবে না। কিন্তু একেক সময় একেক ইনিংসে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, টপ অর্ডার ভেঙে গেলে তাকে আগেভাগে নামতে হচ্ছে, যেখানে তার খেলার ধরন অনুযায়ী স্থির থেকে খেলাই দরকার। যতদিন সে এটা বুঝতে পারবে না, ততদিন এই ধরণের ব্যর্থতা চলবেই।”
প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুও এই প্রসঙ্গে সতর্ক ভাষায় মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না। সিরিজ চলছে, তাই আমরা পর্যবেক্ষণে আছি। ভালো পারফরম্যান্সের মতোই খারাপ পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রেও দলের করণীয় থাকে। দলে আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়া সবসময়ই থাকে।” তাঁর এই বক্তব্য অনেকেই দেখছেন শামীমের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে।
বাংলাদেশ দলে এখন লোয়ার অর্ডারে প্রতিযোগিতা তীব্র। রিয়াদ, আফিফ, এমনকি নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটাররাও ভালো পারফরম্যান্সে জায়গা করে নিচ্ছেন। সেখানে বারবার সুযোগ পেয়ে ব্যর্থ হওয়া শামীমের পক্ষে জায়গা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টির মতো সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে একজন ফিনিশারের কাজ হলো দ্রুত রান তোলা, কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে আউট হলে দলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যে আত্মবিশ্বাস ও আগ্রাসন দিয়ে শামীম পাটোয়ারী একসময় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন, আজ সেই আগ্রাসনই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলের প্রয়োজনে খেলার বদলে তিনি ব্যক্তিগত ছন্দে ব্যাট চালাতে গিয়ে নিজের ও দলের দুইয়েরই ক্ষতি করছেন। ক্রিকেট বোদ্ধারা বলছেন, শামীম যদি নিজেকে মানসিকভাবে পুনর্গঠন করতে না পারেন, তাহলে হয়তো সামনের সিরিজগুলিতে তাঁকে দল থেকে বাদ পড়তে হতে পারে।
তবে অনেকেই মনে করেন, বয়স এখনো কম এবং সময় তাঁর হাতে আছে। যদি তিনি নিজের দুর্বলতা নিয়ে কাজ করেন এবং ফিনিশারের ভূমিকায় মানিয়ে নিতে পারেন, তাহলে আবারও ফিরতে পারেন সেই আলোচনায়, যেখান থেকে তিনি শুরু করেছিলেন।
বাংলাদেশ দলের টিম ম্যানেজমেন্ট এখন নজর রাখছে এই সিরিজের বাকি ম্যাচগুলির দিকে। সেখানে শামীম নিজেকে প্রমাণ করতে পারলে হয়তো সাময়িকভাবে এই সংকট থেকে বের হয়ে আসবেন। কিন্তু ব্যর্থ হলে তাঁর জন্য জাতীয় দলে সময়টা সত্যিই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসবে—যেভাবে ক্রিকেটাররা বলেন, “ফর্ম সাময়িক, কিন্তু ক্লাস স্থায়ী”—শামীমকে এখন সেই ক্লাসটা আবার প্রমাণ করতে হবে মাঠে, কথায় নয়।