প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদনের পঞ্চম দিনের শুনানি আজ বুধবার সকালে শুরু হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ সকাল ১০টার দিকে শুনানি শুরু করেন। এটি বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে, যেখানে গণতন্ত্র, নির্বাচনী নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আদালতে ইন্টারভেনর হিসেবে যুক্তি উপস্থাপন করছেন ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী, আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। এর আগে রিটকারী সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ২১ ও ২২ অক্টোবর প্রথম দুই দিনের শুনানি সম্পন্ন করেন।
প্রধান বিচারপতি শুনানিকালে বলেন, আপিল বিভাগ কোনো সাময়িক সমাধান দিতে চায় না। আদালতের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যা নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশ্নে স্থায়ী সমাধান দিতে পারে। তাঁর ভাষায়, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে দিয়ে সাময়িক স্বস্তি নয়, আমরা এমন কিছু করতে চাই যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করবে।”
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান আদালতে বলেন, গত দেড় দশকে শাসনের নামে জনগণ আসলে শোষণের শিকার হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম-খুন এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের নানা উদাহরণ। তিনি বলেন, “জনগণ আর কাউকে ভয় পায় না। রাজপথ এখনই তাদের হাতে। এই গণআন্দোলনই নির্ধারণ করছে কে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকবে।”
প্রসঙ্গত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত হয় ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। এর লক্ষ্য ছিল নির্বাচনের সময়ে নির্দলীয় একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যাতে প্রশাসন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে। কিন্তু ২০১১ সালে আপিল বিভাগ এই ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ সেটি বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে তিনটি জাতীয় নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে, যা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সবসময়ই প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মামলাটি আবারও আলোচনায় আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর। সরকারের পতনের পর সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক — তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া এবং জাহরা রহমান — ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং নওগাঁর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনও পৃথকভাবে একই ধরনের আবেদন করেন।
এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের পক্ষ থেকে চারটি পৃথক রিভিউ আবেদন একত্রে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য আসে। আদালত ২৭ আগস্ট এসব আবেদনের শুনানির অনুমতি দেন এবং ২১ অক্টোবর থেকে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে যুক্তিতর্ক শুরু হয়।
আইনজীবীরা শুনানিতে ২০১১ সালের রায়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরছেন, যেখানে আপিল বিভাগ তখন ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বাতিল করে বলেছিল, নির্বাহী শাখা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণেই থাকা উচিত। তবে আদালত তখনও বলেছিল, পরবর্তী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে, যাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয়।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, যদি আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের পক্ষে রায় দেয়, তবে এটি কবে থেকে কার্যকর হবে। এ নিয়ে বিচারপতিরাও মতামত জানতে চেয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই রায় কেবল সংবিধান নয়, দেশের আগামী নির্বাচনের ধরন ও রাজনৈতিক ভারসাম্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিন দফায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যার প্রতিটি নির্বাচনই তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু ২০১১ সালের পর থেকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রশ্নেই রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র আকার ধারণ করে, যার পরিণতিতে দেশজুড়ে আন্দোলন, সহিংসতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দেয়।
আজকের শুনানিতে আদালত আবারও জানিয়েছে, তারা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আইনগত বৈধতা ও কার্যকর বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা এমন একটি কাঠামো চাই যা গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে, দলীয় স্বার্থকে নয়।”
শুনানি শেষ না হলেও, এই মামলাকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র আগ্রহ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আইনি মহল, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষ সবাই এখন অপেক্ষা করছে— আপিল বিভাগের রায়ে বাংলাদেশের নির্বাচনী ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে।
এখন দেখা বাকি, আদালতের সিদ্ধান্ত কি নতুন এক রাজনৈতিক ভারসাম্যের সূচনা করবে, নাকি আবারও দেশকে নিয়ে যাবে পুরনো বিতর্কের দিকে।