প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
এশিয়া সফরের শেষ প্রান্তে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আলোচনায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এশিয়া প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি চীনের সঙ্গে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ট্রাম্পের এই সফর শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সময় বুধবার সকালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অবতরণের পর ট্রাম্পকে স্বাগত জানান দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং। এরপর সকালে এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি আমরা চীনের সঙ্গে একটি চুক্তির পথে এগোচ্ছি। এটি হবে এমন একটি চুক্তি যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।” তাঁর এই মন্তব্যের পরই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার ঝড় বয়ে যায়।
এপেক সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির ধারাবাহিকতা ও তার ভবিষ্যৎ অবস্থান সম্পর্কে নতুন প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক নানা ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের আগের মেয়াদে শুরু হওয়া ‘ট্রেড ওয়ার’ বা বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের জবাবে চীন পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল, যার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ধস নামে এবং বহু দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এবারের সফরে ট্রাম্পের ভাষণ ও মন্তব্যে যেন সেই অস্থিরতার জায়গায় এসেছে কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত। বুধবার দুপুরে এপেক শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যাহ্নভোজে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, “চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আমাদের জন্য স্বাভাবিক, কিন্তু আমরা চাই এই প্রতিযোগিতা ন্যায্য হোক, সংঘাতমূলক নয়।” তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চায় যেখানে উদ্ভাবন, পারস্পরিক সম্মান ও স্বাধীন বাজারনীতি বজায় থাকবে।”
এরপর বিকেলে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি, এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। তবে আগামী বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকই হবে এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধ, শুল্কনীতি এবং প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ ইস্যুগুলো নিয়েই সেখানে মূলত আলোচনা হওয়ার কথা।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির খসড়া নিয়ে কাজ করছে, যেখানে উভয় দেশ একে অপরের পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাস করতে পারে। এছাড়া, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), এবং সবুজ জ্বালানি প্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রস্তাবও আলোচনায় থাকতে পারে।
চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জানায়, “যুক্তরাষ্ট্র যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমান সুযোগের ভিত্তিতে চুক্তি করতে চায়, তাহলে চীন সেই পথে আগ্রহী।” যদিও চীনা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের কথার চেয়ে কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দাবি, “যদি যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে শিথিলতা না আনে, তাহলে কোনো চুক্তিই কার্যকর হবে না।”
ট্রাম্পের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহ সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ ও তাইওয়ান প্রণালীর উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারকে এখনো অনিশ্চিত রেখেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক উন্নয়নের যেকোনো পদক্ষেপই বাজারে ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, ট্রাম্প যদি চীনের সঙ্গে একটি কার্যকর বাণিজ্য চুক্তির রূপরেখা দিতে পারেন, তবে সেটি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমালোচকেরা মনে করছেন, এটি কেবল তাঁর প্রচারণামূলক কৌশলেরই অংশ। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভারসাম্য চান, নাকি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাচ্ছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাইকেল গ্রিন বলেন, “এখনকার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহযোগিতা ছাড়া টেকসই বৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই এই বৈঠক যদি ইতিবাচক ফল দেয়, তাহলে সেটা শুধু দুই দেশের নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই শুভ বার্তা হবে।”
তবে সবাই এতটা আশাবাদী নন। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও তাইওয়ান ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এতটাই দূরত্বে যে, এক বৈঠকে সেই জট সহজে কাটবে না। তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতি পরিবর্তন এবং কংগ্রেসে চীনা বিনিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগও ভবিষ্যতে চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া এই সফরকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ হিসেবে দেখছে। প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংয়ের এক উপদেষ্টা বলেছেন, “আমরা চাই দক্ষিণ কোরিয়া হোক এমন এক সেতু, যা ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াবে।”
রাজনৈতিক মহলে এখন মূল প্রশ্ন—ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের এই বৈঠক থেকে আসলে কী ফলাফল বের হবে। এটি কি হবে এক নতুন অর্থনৈতিক যুগের সূচনা, নাকি অতীতের মতোই আরেকটি কূটনৈতিক বিবৃতি মাত্র?
সব নজর এখন বৃহস্পতিবারের দিকে। যদি দুই নেতা চুক্তির কোনো যৌথ ঘোষণা দেন, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নয়, বরং গোটা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
একটি বিষয় এখন নিশ্চিত—এপেক সম্মেলনে ট্রাম্পের এই সফর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নতুন অধ্যায় উন্মোচনের ইঙ্গিত দিয়েছে। আর চীন যদি ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়, তাহলে বহু বছর পর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হতে পারে এক নতুন সহযোগিতামূলক পর্ব।