প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আজ সকালে বোর্ডিং ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সিলেট থেকে লন্ডনগামী ফ্লাইট বিজি–২০২ বাতিল করতে বাধ্য হয় বিমান কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে প্রথমে আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও পরে সবাই নিরাপদে নামতে সক্ষম হন।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে সিলেট থেকে সরাসরি লন্ডনগামী ফ্লাইটটির যাত্রার প্রস্তুতি চলছিল। যাত্রীরা ওঠার পর বোর্ডিং ব্রিজ সরানোর সময় সেটি দুর্ঘটনাক্রমে উড়োজাহাজের ডান পাশের ইঞ্জিন কাভারের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে ইঞ্জিনের বহিরাবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ওই ফ্লাইটে মোট ২৬২ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের অধিকাংশই যুক্তরাজ্যে কর্মরত বা পরিবার পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানান, যাত্রীদের পরবর্তী ফ্লাইটে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং দুপুর আড়াইটার দিকে বিকল্প উড়োজাহাজে তাদের যাত্রা সম্পন্ন হবে।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমেদ বলেন, “বোর্ডিং ব্রিজ সরানোর সময় সেটি দুর্ঘটনাক্রমে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন কাভারের সঙ্গে ধাক্কা খায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে। ইঞ্জিনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরীক্ষা করার জন্য প্রকৌশলীরা কাজ শুরু করেছেন।”
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিলেট স্টেশন ম্যানেজারও জানান, নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। “ইঞ্জিনে ক্ষতি সামান্য মনে হলেও আন্তর্জাতিক রুটে উড্ডয়ন করার আগে পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন বাধ্যতামূলক। যাত্রীদের লন্ডনে পৌঁছাতে বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তাদের আবাসন ও পরিবহন সুবিধার দায়িত্ব বিমান কর্তৃপক্ষই নিচ্ছে।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যাত্রীরা তখনও বোর্ডিং শেষ করেছেন, অনেকে আসন গ্রহণ করেছেন, এমন সময় হঠাৎ বিমান কেঁপে ওঠে। কয়েকজন যাত্রী বিষয়টি বুঝতে না পেরে প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে কর্তৃপক্ষ মাইকে জানায় যে এটি কোনো বড় দুর্ঘটনা নয়, বরং বোর্ডিং ব্রিজের ভুল অবস্থান থেকে সৃষ্ট যান্ত্রিক ধাক্কা।
বিমানবন্দরের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বোর্ডিং ব্রিজ অপারেটর হয়তো সময়ের চাপ বা ভুল হিসাবের কারণে সঠিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারেননি। ফলে ব্রিজের ধাতব কাঠামোটি ইঞ্জিন কাভারের সঙ্গে সংস্পর্শে আসে। এখন ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বিস্তারিত পরিদর্শন চলছে এবং এটি মেরামতের আগে উড়োজাহাজটি ব্যবহার করা হবে না।
এই ঘটনায় বিমানবন্দর ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস উভয় পক্ষই একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে মানবিক ত্রুটি, যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রশিক্ষণজনিত কারণ যাচাই করা হবে।
সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রুটে নিয়মিত যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে নতুনভাবে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে লন্ডন রুটটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম জনপ্রিয় পথ। তাই ফ্লাইট বাতিলের কারণে যাত্রীদের সাময়িক ভোগান্তি হলেও অধিকাংশ যাত্রী কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন।
প্রবাসী এক যাত্রী, যিনি ছুটিতে দেশে এসে পরিবার নিয়ে ফিরছিলেন, বলেন, “আমরা ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু সবাই নিরাপদ আছি দেখে স্বস্তি পেয়েছি। বিমান কর্তৃপক্ষ বিকল্প ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছে, তাই আশা করছি দ্রুত যাত্রা করতে পারব।”
অন্যদিকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বোর্ডিং ব্রিজের যান্ত্রিক অবস্থাও পরীক্ষা করা হবে। যদি এতে কোনো নকশাগত বা স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি পাওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে।
ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং ফায়ার সার্ভিস ও নিরাপত্তা দল তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিমানটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। স্থানীয় সময় দুপুরে বিমানবন্দরের রানওয়ে আবার উড্ডয়নের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, সিলেট থেকে লন্ডনগামী বিজি–২০২ ফ্লাইটটি নিয়মিত সাপ্তাহিক রুটে পরিচালিত হয় এবং এটির যাত্রা সময় প্রায় ১১ ঘণ্টা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, যাত্রীদের কারও অতিরিক্ত ব্যয় হবে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইটের যাত্রীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিকল্প ফ্লাইটে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, বোর্ডিং ব্রিজ সংক্রান্ত দুর্ঘটনা বিরল হলেও এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, কারণ সামান্য ভুলেও উড়োজাহাজের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা বলেন, “এই ধরনের ঘটনায় অপারেটরদের প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।”
দিনের শেষে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিমান উভয়ই নিশ্চিত করেছে যে সকল যাত্রী নিরাপদ আছেন এবং কোনও শারীরিক ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ওসমানী বিমানবন্দরে এই ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। তবে দ্রুত পদক্ষেপ ও যাত্রী ব্যবস্থাপনার দক্ষতায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে—এটা বিমান কর্তৃপক্ষের জন্য প্রশংসনীয় দিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।