পাকিস্তান সীমান্তে ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধ: প্রাণ হারালেন ছয় সেনা, নিহত সাত সন্ত্রাসী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
পাকিস্তান সীমান্তে ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধ: প্রাণ হারালেন ছয় সেনা, নিহত সাত সন্ত্রাসী

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়ার দুর্গম কুররাম জেলা আবারও রক্তাক্ত সংঘর্ষের সাক্ষী হলো। দেশটির সেনাবাহিনী ও ভারত-সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘ফিতনা আল খোয়ারিজ’-এর মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধে এক তরুণ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নোমান সেলিমসহ ছয় পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন। পাল্টা অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে সাতজন সন্ত্রাসী প্রাণ হারায়। বুধবার পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এক্সপ্রেস ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হয়।

আইএসপিআর জানায়, সম্প্রতি কুররাম জেলার ডোগার এলাকায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর অভিযান শুরু করা হয়। এই তথ্যানুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী বুধবার সকালে ওই অঞ্চলে বিশেষ অভিযান চালায়। অভিযানের শুরুতেই সন্ত্রাসীরা ভারী অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। এতে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধের সৃষ্টি হয়। গোলাগুলির শব্দে সীমান্তবর্তী জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

অভিযান চলাকালীন সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছয় সদস্য। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তরুণ মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন নোমান সালিম (২৪), হাবিলদার আমজাদ আলী (৩৯), নায়ক ওয়াকাস আহমদ (৩৬), সিপাহী আইজাজ আলী (২৩), সিপাহী মুহাম্মদ ওয়ালিদ (২৩) এবং সিপাহী মুহাম্মদ শাহবাজ (৩২)। আইএসপিআর তাদের ‘জাতির বীর সন্তান’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং বলেছে, তারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর গুলিতে সাতজন সন্ত্রাসী নিহত হয়। তাদের পরিচয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে পাকিস্তানি সামরিক সূত্রের দাবি, নিহতরা ‘ফিতনা আল খোয়ারিজ’ নামে এক ভারত সমর্থিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সদস্য। এই গোষ্ঠীটি আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’(RAW)-এর সহায়তায় সক্রিয় বলে উল্লেখ করেছে সামরিক বাহিনী।

আইএসপিআরের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কুররাম জেলায় অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী লুকিয়ে থাকা অন্য সন্ত্রাসীদের নির্মূল না করা পর্যন্ত অপারেশন বন্ধ করবে না। বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রী আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত “আজম-ই-ইস্তেহকাম” অভিযানের অংশ হিসেবে বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এই সংঘর্ষ পাকিস্তান-আফগান সীমান্তের অস্থিরতা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় বিদেশি প্রভাবের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। কুররাম জেলা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনার জন্য সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানের সরকারি সূত্রগুলো দাবি করছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর সহায়তায় আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে, যা সীমান্তের নিরাপত্তাকে চরমভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এমন সংঘর্ষ দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তারা মনে করছেন, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তে আফগানিস্তানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা মিলিয়ে নতুন করে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। বিশেষ করে, আফগানিস্তান থেকে তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠার পর থেকে পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে নিরাপত্তা টহল জোরদার করা হয়েছে, কিন্তু তাতেও স্থায়ী সমাধান আসছে না।

আইএসপিআর জানিয়েছে, অভিযানে অংশ নেওয়া বাহিনী এলাকার চারপাশে তল্লাশি চালিয়ে সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত অস্ত্র, গুলির খোসা এবং ভারতীয় উৎপাদিত যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। এসব সরঞ্জাম দেখে সামরিক গোয়েন্দারা মনে করছেন, সন্ত্রাসীদের এই দলটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখে।

সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে এবং তাদের আত্মত্যাগকে দেশের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ারুল হক কাকরও এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমাদের সাহসী সেনারা জাতির মর্যাদা রক্ষার জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন, এবং পাকিস্তান শেষ সন্ত্রাসী নিধন না করা পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।”

কুররাম জেলার স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংঘর্ষের পর এলাকা জুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী অতিরিক্ত টহল মোতায়েন করেছে, ড্রোন নজরদারি চলছে এবং সীমান্তের বিভিন্ন প্রবেশপথে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলেও সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।

জাতিসংঘ এবং দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা সীমান্ত অঞ্চলে সংঘর্ষ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, পাকিস্তান ও আফগান সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলা অস্থিতিশীলতা শুধু নিরাপত্তা নয়, মানবিক দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলছে। এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবিকা, কৃষিকাজ এবং বাণিজ্য কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সীমান্ত সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং একইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা মোকাবিলা করা। এই ঘটনাটি শুধু সামরিক দিকেই নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

আইএসপিআরের বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই অভিযান অব্যাহত রাখবে। জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয় এবং স্থানীয়দের সহযোগিতার ভিত্তিতে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করার আশ্বাস দেওয়া হয়।

কুররাম সীমান্তে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আবারও প্রমাণ করেছে, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে সন্ত্রাসবাদের শিকড় এখনো পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি। সেনাবাহিনীর অভিযানে আপাত সাফল্য এলেও সীমান্তের শান্তি এখনো অনেক দূরের বিষয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত