‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া কংগ্রেস নেতাদের ধরার নির্দেশ আসামের মুখ্যমন্ত্রীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া কংগ্রেস নেতাদের ধরার নির্দেশ আসামের মুখ্যমন্ত্রীর

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

শ্রীভূমি, আসাম: ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বাংলাদেশি জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া কংগ্রেস কর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা রুজু করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল প্রেক্ষাপট হলো গত সোমবার করিমগঞ্জ জেলার শ্রীভূমি শহরে কংগ্রেস সেবাদলের একটি বৈঠকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এই গান পরিবেশন।

বুধবার মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা আসাম পুলিশের কাছে নির্দেশ দেন, যেন অপরাধী নেতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, “কংগ্রেসের এই কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, এটি দেশের জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এমন কর্মকাণ্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিভক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।”

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল, যখন কংগ্রেস নেতা বৈঠকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি পরিবেশন করেন। ১৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন আসামের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী অশোক সিংঘল। তিনি ওই পোস্টে লিখেছেন, “কংগ্রেসের সভায় সেই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হচ্ছে, যারা উত্তর-পূর্ব ভারতকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।”

অশোক সিংঘলের অভিযোগ, কংগ্রেস ভোট ব্যাংকের রাজনীতি করে এবং এর মাধ্যমে আসামের জনসংখ্যার গঠন পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “কংগ্রেস বাংলাদেশকে বড় করে গড়ে তুলতে চায়, যা ভারতের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের পর রাজ্যের বিজেপি নেতারা মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এর প্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর হিমন্ত বিশ্বশর্মা সাংবাদিকদের বলেন, “অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কংগ্রেসের এই কর্মকাণ্ড ভারতের জাতীয় সংগীত ও দেশপ্রেমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি এক ধরনের জাতীয় অবমাননা।”

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “কংগ্রেসের সভা শুরু হয় ভারতের নয়, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে। এটি দেশের জনগণ ও জাতীয় সংগীতের প্রতি অবমাননার পরিচায়ক। তাই শ্রীভূমির কংগ্রেস কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেসের নেতাদের শিগগিরই গ্রেপ্তার করা হবে।”

বিপরীত দিক থেকে কংগ্রেসও সরব হয়েছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, “‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন। এই গানের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির আবেগ ও ইতিহাস জড়িত। বিজেপি সবসময় বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলার মানুষকে অপমান করে। তারা বাংলার ইতিহাস বোঝে না, শুধু ভোটের রাজনীতি করে।”

গগৈ আরও বলেন, “বিজেপি এই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে মূল সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য। এটি এক ইচ্ছাকৃত, অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রয়াস। তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান রাজনৈতিক নয়, এটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

রাজ্য বিজেপির পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা হয়েছে, “কংগ্রেস বাংলাদেশের মোহে আচ্ছন্ন। মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে নিয়ে বাংলাদেশ এক মানচিত্র প্রকাশ করেছিল। এখন বাংলাদেশ নিয়ে কংগ্রেস আসামে গর্বের সঙ্গে জাতীয় সংগীত গাইছে। যারা কংগ্রেসের উদ্দেশ্য বুঝতে পারছেন না, তারা হয় অন্ধ, বা মদদদাতা, অথবা উভয়ই।”

কংগ্রেসের নেতারা আরও জানান, এই গানটি ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ব্রিটিশ শাসনের সময়ে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলে এই গানকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দেওয়া হয়। তাই গানটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশিত হয়েছিল।

কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ বলেন, “বিজেপি বাংলার সংস্কৃতি ও জনগণকে রাজনৈতিক আঙিনায় ব্যবহার করছে। তারা বাঙালিদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক মূল্য বোঝে না। আমাদের লক্ষ্য এই যে, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সম্মান দেওয়া হোক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে জনগণ বিভ্রান্ত না হোক।”

বিবৃতিতে কংগ্রেস নেতারা জোর দিয়ে বলেন, বিজেপি ভোটের জন্য বাঙালিদের প্রতিকৃতি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তারা ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে রাজনৈতিক আক্রমণের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। কংগ্রেসের মতে, গানটি বাঙালি ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ, যার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অনভিপ্রেত।

এই ঘটনার পর রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ, কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া, এবং সামাজিক মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশ সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নির্দেশে মামলা রুজু করার পর আসামের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত