প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । ক্রীড়া প্রতিবেদক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টি–টোয়েন্টি ম্যাচে ব্যাট হাতে ঝড় তুলেছিলেন তানজিদ হাসান তামিম। ৪৮ বলে ৬১ রানের ইনিংস খেলেও দলকে জয় এনে দিতে পারেননি এই তরুণ ওপেনার। তবু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এক বছরে বাংলাদেশের হয়ে টি–টোয়েন্টিতে সর্বাধিক রান সংগ্রাহকের তালিকায় এবার সবার ওপরে উঠেছেন তানজিদ।
ওই ম্যাচে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল ১৫০ রান। এমন লক্ষ্যে ওপেনার হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল ইনিংসকে শক্ত ভিত দেওয়া, যা তিনি সফলভাবেই পালন করেছেন। ছয় বাউন্ডারি ও দুটি ছক্কার ইনিংস খেললেও সঙ্গী ব্যাটারদের ব্যর্থতায় ম্যাচ শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয় ১৪ রানে। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের বিচারে তানজিদের ব্যাটে এসেছে নতুন মাইলফলক—এক ক্যালেন্ডার বছরে বাংলাদেশের হয়ে সর্বাধিক টি–টোয়েন্টি রান এখন তাঁর দখলে।
চলতি বছর ২৩ ইনিংসে ৬২২ রান করেছেন এই বাঁহাতি ওপেনার। তাঁর ব্যাটিং গড় ২৯.৬১ এবং স্ট্রাইক রেট ১৩৫.২১—যা বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক টি–টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ওপেনারদের মধ্যে অন্যতম সেরা। এ বছর তিনি করেছেন ছয়টি অর্ধশতক এবং ছক্কা মেরেছেন ৩৪টি, যা বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের পক্ষে এক বছরে সর্বাধিক ছক্কার রেকর্ডও বটে।
এই রেকর্ডে তানজিদ পেছনে ফেলেছেন আগের রেকর্ডধারী মোহাম্মদ নাঈমকে। ২০২১ সালে নাঈম ২৬ ইনিংসে করেছিলেন ৫৭৫ রান। তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ১০০.৩৪ এবং গড় ২৩। সে বছর তিনটি অর্ধশতক করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ নাঈমকে ছাড়িয়ে তানজিদ শুধু বেশি রানই করেননি, বরং অনেক ভালো স্ট্রাইক রেট ও ধারাবাহিকতায় খেলেছেন পুরো বছরজুড়ে।
তানজিদের পরে তালিকায় আছেন লিটন দাস। চলতি বছর ২১ ইনিংসে লিটন করেছেন ৫৬৪ রান, স্ট্রাইক রেট ১৩২.৭০ এবং চারটি অর্ধশতকসহ গড় ২৯.৬৮। লিটন ২০২২ সালেও উজ্জ্বল ছিলেন, তখন করেছিলেন ৫৪৪ রান, স্ট্রাইক রেট ছিল ১৪০.২০। এ বছর তাঁর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতাও দলকে বেশ কয়েকটি ম্যাচে জয়ের ভরসা দিয়েছে।
এক বছরে ৫০০ রানের ক্লাবে বাংলাদেশের আরেক সদস্য আফিফ হোসেন। ২০২২ সালে আফিফ করেছিলেন ৫০০ রান, স্ট্রাইক রেট ছিল ১২৩.৭৬। নিয়মিত সুযোগ পেলে তিনি আরও ভালো করতে পারতেন বলেই মনে করেন অনেকে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের মধ্যে কেউই এখনো এক বছরে ৫০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেননি। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ—এই তিন তারকা কখনই এক ক্যালেন্ডার বছরে ৫০০ রানের ঘর ছুঁতে পারেননি। মাহমুদউল্লাহর সর্বোচ্চ ৪৯৬ রান আসে ২০২১ সালে, আর ২০১৮ সালেও তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৪১৪ রান।
মুশফিক ও সাকিবের ক্ষেত্রে চিত্রটা আরও ভিন্ন। সাকিবের এক বছরে সর্বাধিক রান ৩৪৯, যা তিনি করেছিলেন ২০২২ সালে। অন্যদিকে মুশফিকুর রহিমের সর্বাধিক ৩৯৭ রান আসে ২০১৮ সালে। দুজনই বাংলাদেশের হয়ে শতাধিক টি–টোয়েন্টি খেললেও বছরে নিয়মিত বড় ইনিংস খেলতে না পারার কারণেই তাঁরা ৪০০ রানের সীমা ছুঁতে পারেননি।
তানজিদের এই পারফরম্যান্সকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের শুরু থেকে তাঁর ধারাবাহিক রান করা, পাওয়ারপ্লেতে দ্রুত শুরু, এবং ইনিংসের মাঝামাঝি ধাপে গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাঁকে ভবিষ্যতের টি–টোয়েন্টি দলের অন্যতম মূল ভরসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার বলেন, “তানজিদ এখন শুধু টেকনিক্যালি নয়, মানসিকভাবেও পরিণত ব্যাটার। সে জানে কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে ইনিংস গড়তে হয়। এই পরিণত ব্যাটিংয়ের কারণেই সে ধারাবাহিকভাবে রান করছে।”
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে তানজিদের পারফরম্যান্স বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের একমাত্র উজ্জ্বল দিক। অন্যরা যেখানে ব্যর্থ, সেখানে তাঁর দৃঢ়তা ও স্ট্রোক খেলার মানসিকতা দলের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
যদিও দলের পরাজয় তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দ কিছুটা ম্লান করেছে, তবু বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এই তরুণ ওপেনারের নাম এখন স্থায়ীভাবে লেখা হলো এক নতুন অধ্যায়ে—এক বছরে বাংলাদেশের হয়ে সর্বাধিক টি–টোয়েন্টি রান সংগ্রাহক হিসেবে।
তানজিদের এই অর্জন নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের ক্রিকেটারদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে আরও বহু রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা তাঁর সামনে উন্মুক্ত।