শ্যালিকাকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দুলাভাইসহ চারজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৭ বার
শ্যালিকাকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে দুলাভাইসহ চারজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ফরিদপুরে এক তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় আদালত দুলাভাইসহ চারজনের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন। প্রায় তেরো বছর আগে সংঘটিত সেই নৃশংস ঘটনাটির বিচারে আজ অবশেষে ন্যায়বিচার পেয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ শামীমা পারভীন এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। আদালত ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে দুটি পৃথক ধারায় সাজা ঘোষণা করেন—হত্যার দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার জাহাঙ্গীর ব্যাপারী (৩৮), কামরুল মৃধা (৩৮), আলী ব্যাপারী (৪৩) ও বক্কার ব্যাপারী (৩৮)। তাঁদের প্রত্যেককে হত্যার দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ধর্ষণের ঘটনায় চারজনকেই যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। আদালত আরও নির্দেশ দেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দুই সাজা একসঙ্গে ভোগ করতে পারবেন, তবে উভয় দণ্ডের আর্থিক জরিমানা পরিশোধ করতে হবে আলাদাভাবে।

এ মামলার আরও দুই আসামি—মমতাজ বেগম (৬৩) ও আলী ব্যাপারীর বাবা আবুল কালাম ব্যাপারী (৬৮)—কে মামলার আলামত নষ্ট করার অভিযোগে পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও ছয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

রায় ঘোষণার সময় আসামিদের মধ্যে জাহাঙ্গীর ব্যাপারী ছাড়া সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় শুনে উপস্থিত আসামিদের মুখে হতভম্ব নীরবতা নেমে আসে, আর আদালতের বাইরে ন্যায়বিচার পাওয়ার আনন্দে ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনরা অশ্রুসিক্ত হন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ১ অক্টোবর রাত একটার দিকে সদরপুর উপজেলার একটি গ্রামে ওই তরুণীর বাড়িতে হামলা চালায় দুলাভাই জাহাঙ্গীর ব্যাপারী ও তাঁর সহযোগীরা। জাহাঙ্গীর তাঁর স্ত্রী বাড়িতে এসেছেন বলে জানিয়ে দরজা খুলতে বলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই চারজন ভেতরে প্রবেশ করে ওই তরুণীকে জোরপূর্বক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে এবং শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে তাঁরা মরদেহটি ঘরের ভেতর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

এ ঘটনায় দীর্ঘ বিলম্বে ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর ভুক্তভোগীর মা আদালতে মামলা দায়ের করেন, কারণ স্থানীয় থানায় মামলা নেওয়া হয়নি। বহু প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘসূত্রতার পর অবশেষে মামলার তদন্ত সম্পন্ন হয়। ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দেয়। এরপর একে একে সাক্ষ্য, প্রমাণ ও জেরা শেষে আজ ঘোষিত হলো বহুল প্রতীক্ষিত এই রায়।

মামলার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া বলেন, “২০১২ সালে ঘটনাটি সংঘটিত হলেও থানা মামলা নেয়নি, তাই ভুক্তভোগীর পরিবার বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়। এরপর দীর্ঘ তদন্ত, কর্মকর্তা বদল ও সময়ক্ষেপণের পর অবশেষে সত্য উদঘাটিত হয়েছে। ন্যায়বিচার পেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট।”

তিনি আরও বলেন, এই মামলায় মোট সাতজন তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করেছেন। প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপনে সময় লেগেছে বছর কয়েক, তবে আদালত যে রায় দিয়েছেন, তা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ভুক্তভোগী তরুণীর পরিবার রায়ের পর সাংবাদিকদের জানায়, “আমরা খুব কষ্টে এত বছর অপেক্ষা করেছি। এখন মনে হচ্ছে মেয়ের আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।”

ফরিদপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এ রায় স্থানীয় মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এমন কঠোর দণ্ড ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

রায় ঘোষণার পর আদালতের বিচারক শামীমা পারভীন পর্যবেক্ষণে বলেন, “এই অপরাধ সমাজে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এমন জঘন্য অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। আইন সবার জন্য সমান—এ রায় তারই প্রমাণ।”

তেরো বছর আগের একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারে এভাবে দণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ায় ফরিদপুরবাসী মনে করছে, ন্যায়বিচার অবশেষে প্রতিষ্ঠিত হলো—যদিও সময় লেগেছে এক যুগেরও বেশি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত