প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মিশরের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাবিল ফাহমি বলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পুরো দায় হামাসের ওপর আরোপ করা সঠিক নয়। বরং ইসরাইলের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বই এই সংঘাতের মূল কারণ। তিনি বলেন, “ইসরাইলি দখলদারিত্ব ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে, এবং এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ঘটনার বিশ্লেষণ করা যাবে না।”
ফাহমি এই মন্তব্য করেছেন বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গণমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। গতকাল সন্ধ্যায় এমবিসি মাসর চ্যানেলের ‘ইয়াহদুস ফি মিসর’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক শেরিফ আমেরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ৮ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান ছিল আগের দিনের ঘটনার প্রতিক্রিয়া, তবে সেই প্রতিক্রিয়ারও সীমা থাকা উচিত ছিল।
হামাসের ৭ অক্টোবরের অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত সমালোচনার জবাবে ফাহমি বলেন, “যদি আমরা একই যুক্তিতে কথা বলি, তাহলে কেন ইসরাইল তার দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্বের পরিণতি বিবেচনা করেনি, যার ফলেই এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছে? উভয় পক্ষের পদক্ষেপই ভুল এবং উভয়ই বিপজ্জনক।”
ফাহমি আরও উল্লেখ করেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলের E1 বসতি প্রকল্প, ক্রমবর্ধমান অস্ত্রধারণের উদ্যোগ এবং নেসেট অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলে বিশাল হুমকি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “এখন পুরো পশ্চিম তীর আগুনে জ্বলছে এবং মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে।”
তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে জনমতের পরিবর্তনকেও আলোকপাত করেন। ফাহমির ভাষ্য, “গাজার ধারাবাহিক হত্যাযজ্ঞ ও প্রাণহানির ছবি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা পূর্ব বা পশ্চিমের হাজারো বক্তৃতা বা রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলছে। আর এখন আর আমেরিকান জনগণ ইসরাইলের প্রচারিত ধারণা গ্রহণ করছে না যে তারা একটি দুর্বল রাষ্ট্র। ১,২০০ জনের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ৬৫,০০০ জনের হত্যাকাণ্ড ন্যায্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে না।”
তিনি বলেন, “সম্প্রতি যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইসরাইলের সবচেয়ে বড় শত্রু কে, আমি বলেছিলাম—ইসরাইল নিজেই।”
ফাহমির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান দখলদারিত্ব এবং অব্যাহত সহিংসতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি বলেন, যে কোনো সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে দায় নির্ধারণের আগে ইতিহাস, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
ফাহমি আশা প্রকাশ করেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দু’পক্ষের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা ঘটাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তিনি বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নীতি পরিবর্তিত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘাত চলতেই থাকবে।”
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাহমির এই মন্তব্য ইসরাইল-প্যালেস্টাইন সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাসকে পুনঃমূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করছে। তিনি শুধু হামাসের কাণ্ডকে নয়, বরং ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও ইসরাইলের নীতি-নীতির প্রভাবকেও সামনে এনেছেন, যা পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রাজনীতির আলোচনাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ফাহমির বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে এসেছে যে, সংঘাতের মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করা ছাড়া কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “শুধু ক্ষুদ্র ঘটনার প্রতিক্রিয়াকেই দায় দেওয়াই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব ও দমননীতি বিশ্লেষণে প্রধান প্রভাবশালী বিষয়।”
এতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য শুধুমাত্র সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ইতিহাস, রাজনৈতিক দখল, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফাহমির মন্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, গাজা অঞ্চলে চলমান পরিস্থিতি শুধুমাত্র সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নীতি পরিবর্তন, দখলদারিত্বের সমাপ্তি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।