দেশেই ঘনিষ্ঠজনকে কিডনি ও অঙ্গ দানের সুযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
হাদি হত্যার বিচার হবে ৯০ দিনের মধ্যে: আইন উপদেষ্টা

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে। মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন সম্পর্কিত ‘মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এর খসড়াকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। নতুন আইনে শুধু পরিবারের সদস্যই নয়, বরং আবেগগতভাবে ঘনিষ্ঠ বা আন্তরিক সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিরাও এখন নিঃস্বার্থভাবে কিডনি কিংবা অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন।

বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানান, এতদিন বাংলাদেশে কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রক্তসম্পর্কীয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই দান ও গ্রহণের অনুমতি ছিল। এতে অনেক সময়ই অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা থাকা রোগীরা সীমাবদ্ধতায় পড়তেন। অনেককে বাধ্য হয়ে বিদেশে যেতে হতো—যেখানে অনেকে অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে অঙ্গ সংগ্রহের মতো অনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তেন।

তিনি বলেন, “আমরা এই আইনের মাধ্যমে সেই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসার পথ তৈরি করেছি। এখন শুধু পরিবারের সদস্য নয়, বরং এমন কেউ—যার সঙ্গে দাতা ব্যক্তিগত বা মানসিকভাবে গভীর সম্পর্ক রাখেন—তিনিও যদি নিঃস্বার্থভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে চান, তা আইনসম্মতভাবে করা যাবে। এতে দাতার ইচ্ছা এবং গ্রহীতার প্রয়োজন—দুটোকেই সম্মান দেওয়া সম্ভব হবে।”

নতুন এই অধ্যাদেশে ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ বিষয়টি আইনি ভাষায় সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে বলে জানান আসিফ নজরুল। এতে বলা থাকবে, বন্ধুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সহকর্মী, প্রতিবেশী বা দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা ব্যক্তি যদি নিঃস্বার্থভাবে অঙ্গ দান করতে চান, তিনি তা করতে পারবেন—তবে কোনোভাবেই আর্থিক লেনদেন জড়িত থাকবে না।

আইন উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, এই আইন কার্যকর হলে বিদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন অনেক কমে যাবে এবং দেশে চিকিৎসার মান বাড়বে। তিনি বলেন, “যারা এতদিন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশে যাচ্ছিলেন, তারা এখন দেশেই আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে এই চিকিৎসা নিতে পারবেন। এতে চিকিৎসা খরচ অনেক কমবে, সময়ও বাঁচবে।”

এ সময় তিনি আরও জানান, নতুন আইনের অধীনে একটি কঠোর যাচাই-বাছাই কমিটি থাকবে, যারা প্রতিটি অঙ্গদানের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে। এর মাধ্যমে অঙ্গ বিক্রি বা দানের নামে কোনো ধরনের মানব পাচার বা আর্থিক অনৈতিকতা যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করা হবে।

এ অধ্যাদেশ পাসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি মানবিক ও যুগোপযোগী সংস্কার ঘটল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসক সমাজও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছেন, অনেক সময় দেখা যায়, রোগীর পরিবারে উপযুক্ত দাতা না থাকায় জীবন বাঁচানোর সুযোগ হারাতে হয়। এখন ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে থেকেও দাতা পাওয়া গেলে তা অনেক জীবনের সম্ভাবনা বাড়াবে।

ঢাকার এক নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞ বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও মানবিক উদ্যোগ। এতে একদিকে যেমন মানুষকে অঙ্গ পাচারকারী চক্রের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে, অন্যদিকে নিঃস্বার্থ অঙ্গদানের সংস্কৃতি সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবে।”

অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, “এই আইনের মাধ্যমে আমরা দুটি দিক বিবেচনায় নিয়েছি—একটি মানবিক, আরেকটি বাস্তব। মানবিক দিক হলো, অনেক সময় মানুষ কারও প্রতি গভীর ভালোবাসা বা বন্ধনের কারণে জীবন বাঁচাতে চায়, কিন্তু আইনগত সীমাবদ্ধতা তাকে বাধা দেয়। আর বাস্তব দিক হলো, অনেকেই এ কারণে বিদেশে গিয়েছেন, বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। এখন আমরা চাই, দেশের ভেতরেই নিরাপদ ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে চিকিৎসা হোক।”

বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ অনুমোদন পেয়েছে—‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ’। এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা জানান, “আমাদের দেশে গণঅভ্যুত্থান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসকে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের লক্ষ্যে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সেই সময়ের যে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী গণহত্যার দায়ে বিচারাধীন, তার ব্যবহৃত বাসভবনটি এখন জুলাই জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এটি কোনো শাখা জাদুঘর নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ‘আয়নাঘর’ রয়েছে, সেখানে জুলাই জাদুঘরের শাখা সম্প্রসারণের সুযোগও রাখা হয়েছে।”

এই সিদ্ধান্ত দেশের ইতিহাসচর্চা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন ইতিহাসবিদরা।

স্বাস্থ্য নীতির পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস সংরক্ষণের এই দুই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নাগরিক সমাজের অনেকেই বলছেন, সরকার যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এটি কেবল চিকিৎসা নয়, মানবতার এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

অন্যদিকে, অঙ্গদানের নৈতিক দিকটি নিয়েও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, “ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক” সংজ্ঞাটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করা হলে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকে যাবে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, খসড়া আইনে একটি শক্তিশালী মনিটরিং বোর্ড থাকবে, যারা প্রতিটি দান ও প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নৈতিক অনুমোদন দেবে।

সামগ্রিকভাবে নতুন অধ্যাদেশটি দেশের চিকিৎসা খাতের জন্য এক বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে এটি মানবিক বিবেচনাকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশ নির্ভর ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশীয় সক্ষমতাকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করছে।

বৈঠক শেষে অধ্যাপক আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, “মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান কোনো বাণিজ্য নয়, এটি ভালোবাসা ও মানবতার এক গভীর প্রকাশ। আমরা চাই এই আইনের মাধ্যমে সেই মানবিকতাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাক।”

বাংলাদেশের চিকিৎসা ও আইনি ইতিহাসে তাই ২০২৫ সালের এই সিদ্ধান্ত এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে—যেখানে একজন মানুষ অন্য একজনের জীবন রক্ষায় নিঃস্বার্থভাবে হাত বাড়াতে পারবে, এবং সেই মানবিকতা পাবে আইনসম্মত মর্যাদা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত