প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে নতুন বার্তা দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির প্রতি দুর্বলতা প্রদর্শন করা যাবে না। পুলিশকে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার আয়োজিত ডিএমপির গ্র্যান্ড কল্যাণ সভায় এই বার্তা দেন কমিশনার।
সভায় ডিএমপি কমিশনার বলেন, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হতে যাচ্ছে। বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এবার সেই সুযোগ সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত করতে পুলিশকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, “যেন কোনো নাগরিক ভয়ভীতি ছাড়াই ভোট দিতে পারেন, সেটাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। দেশের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে আমাদের কাজেই প্রমাণ রাখতে হবে যে, পুলিশ জনগণের জন্য কাজ করে—কোনো রাজনৈতিক পক্ষের জন্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপি একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। তাই আমাদের কর্মকাণ্ড এমন হতে হবে যাতে জনগণের আস্থা অটুট থাকে। ২০১৮ সালের কালিমালিপ্ত নির্বাচনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা হতে দিতে পারি না। যারা তখনকার অনিয়ম ও সহিংসতায় জড়িত ছিল, তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
সভায় কমিশনার সাজ্জাত আলী মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় ধৈর্য ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। কোনো উস্কানিতে প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না। তিনি বলেন, “বেআইনি সমাবেশ বা রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় আমাদের এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে যাতে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না হয়। পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো—সেটা নষ্ট হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে।”
ডিএমপি কমিশনার আরও জানান, দায়িত্ব পালনকালে কোনো পুলিশ সদস্য আহত হলে তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বহন করবে। পাশাপাশি তিনি সবাইকে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে ফিট রাখা একজন দায়িত্বশীল সদস্যের কর্তব্য। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও অনুরোধ করেন, অধীনস্থ সদস্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে এবং তাদের কল্যাণে সবসময় সচেষ্ট থাকতে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) মো. সরওয়ার, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন মো. নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (লজিস্টিকস, ফিন্যান্স অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট) হাসান মো. শওকত আলী, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. জিল্লুর রহমানসহ ডিএমপির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা। সভায় প্রায় ৮৫০ জন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
সভায় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) মো. সরওয়ার থানাগুলোর সেবা কাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে বলেন, “থানায় আগত সেবাপ্রত্যাশীদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে আমরা থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপন করছি। সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নই এখন আমাদের অগ্রাধিকার।”
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “অনেক থানা, ফাঁড়ি ও কোর্টের মালখানার অবস্থা নাজুক। আমরা সেগুলো সংস্কার করে কর্মীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির কাজ করছি। একই সঙ্গে সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে—তাই সবাইকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল থাকতে হবে।”
সভায় ডিএমপি কমিশনার বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, “এ নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি দেশের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। সুতরাং আমাদের দায়িত্ব শুধু নিরাপত্তা দেওয়া নয়, বরং দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি রক্ষায় ভূমিকা রাখা।” তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ডিএমপি সদস্যরা অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেবেন।
রাজনৈতিক অঙ্গন যখন নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনের সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিএমপি কমিশনারের এই বক্তব্য সেই প্রেক্ষাপটে একটি দিকনির্দেশক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি তার বক্তৃতায় পরিষ্কার করে দিয়েছেন, পুলিশ বাহিনী কোনো চাপ, প্রলোভন বা রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতিস্বীকার করবে না।
সভা শেষে ডিএমপির সদস্যদের মধ্যে নতুন কল্যাণমূলক প্রকল্প ও স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। কমিশনার জানান, প্রতিটি থানায় একটি করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে পুলিশ সদস্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা সহজ হয়।
আসন্ন নির্বাচনের আগে এ ধরনের স্পষ্ট বার্তা মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মনোবল জোগাবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যটি একটি ইতিবাচক বার্তা, যা জনগণের আস্থার জায়গা আরও দৃঢ় করবে।