সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনকে ঘিরে বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনকে ঘিরে বিতর্ক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সম্প্রতি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), এএফপি, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস এবং দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশের পর বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, বরং সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ পাঠকের মাঝেও নানা প্রতিক্রিয়া জন্ম দিয়েছে।

একদিকে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারগুলোকে অনেকেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বলছেন, অন্যদিকে এই সাক্ষাৎকারগুলোতে দেশীয় সাংবাদিকদের অনুপস্থিতি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিশেষ করে কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনকে কেন্দ্র করে মতভেদে জড়িয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন, দেশীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অভিজ্ঞ ও সমালোচনামূলক প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা রাখেন এমন সাংবাদিকদেরও সাক্ষাৎকারের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। আবার অনেকে মনে করছেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া মানে হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি ও বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া, যা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

রয়টার্সে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজ একসময়কার সংকট থেকে অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। উন্নয়ন, নারী শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনে আমরা যে অগ্রগতি দেখিয়েছি, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।”

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গে আলাপচারিতায় তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, “আমাদের উন্নয়নধারা থেমে থাকবে না। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনই আগামী বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।”

এরপর ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির সঙ্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। ভারতের দ্য হিন্দুস্তান টাইমস ও যুক্তরাজ্যের দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট এও তাঁর বক্তব্য প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশের ভূমিকার ওপর জোর দেন।

এই ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের পর থেকেই বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় নতুন এক বিতর্ক। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কেন দেশের কোনো শীর্ষ সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারের সুযোগ দেওয়া হলো না। ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ও ইউটিউবের বিভিন্ন আলোচনায় ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কিছু ব্যবহারকারী মনে করছেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলো সরকারের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, “দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা তুলে ধরতে দেশীয় সাংবাদিকরা আরও গভীর প্রশ্ন করতে পারতেন।”

এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় উঠে আসেন সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমে কাজ করছেন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবেও পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ভিন্নমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ তাঁকে নিরপেক্ষ ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ মনে করেছেন, তাঁর সমালোচনামূলক ভঙ্গি অনেক সময় অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক।

মূলত শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার তালিকায় দেশীয় সাংবাদিকদের না থাকা নিয়েই অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেখানে কেউ কেউ খালেদ মহিউদ্দিনের নাম টেনে এনে বলেন, তাঁর মতো সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলে দেশীয় দর্শকরা আরও বাস্তবসম্মত আলাপ শুনতে পারতেন। তবে বিপরীত পক্ষের অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাধারণত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয় কূটনৈতিক বা নীতিগত কারণে, যেখানে প্রশ্নের ধরন ও আলোচনার বিষয়বস্তু আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়।

একজন গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “এটি মূলত এক ধরনের ইমেজ ম্যানেজমেন্ট। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর পাঠক ও শ্রোতারা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখেন, তাই এমন সাক্ষাৎকার কৌশলগতভাবে দেওয়া হয়।”

সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, বিতর্কের মূল বিষয় আসলে ‘কে সাক্ষাৎকার নিল’ নয়, বরং ‘কীভাবে তথ্য উপস্থাপিত হলো’। একজন সিনিয়র সাংবাদিক মন্তব্য করেন, “একজন সাংবাদিকের কাজ হলো প্রশ্ন তোলা, কিন্তু সে প্রশ্নটি কাকে করা হচ্ছে, সেটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই প্রশ্নের পেছনে পেশাদারিত্বের মানদণ্ড।”

খালেদ মহিউদ্দিন নিজেও সম্প্রতি একটি অনলাইন আলোচনায় বলেছেন, “সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সত্য তুলে ধরা, সেটা যে পক্ষেরই হোক না কেন। আমি বিশ্বাস করি, পেশাদার সাংবাদিকতা কখনও কারও প্রতি তেলবাজি বা বিদ্বেষের জায়গা থেকে পরিচালিত হয় না।”

এই মন্তব্যের পরও সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। কেউ কেউ তাঁর পুরোনো সাক্ষাৎকারের অংশ শেয়ার করে সমালোচনা করছেন, আবার কেউ তাঁর পেশাগত অবস্থান রক্ষার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশাগত সংগঠনগুলোও এই বিতর্কের প্রতি নজর দিয়েছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির এক সদস্য বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন ট্রল বা আক্রমণ সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত না হয়।”

অন্যদিকে, কিছু গণমাধ্যম বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ঘটনাটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা সংস্কৃতির একটি প্রতিচ্ছবি—যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা অনেক সময় পেশাদার বিতর্কের জায়গা দখল করে নেয়। একজন বিশ্লেষক বলেন, “আমরা অনেক সময় বিষয় থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আলোচনা করি। অথচ মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত ছিল শেখ হাসিনার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নীতি নির্দেশনা।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই বিতর্ক একদিকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে দেখাচ্ছে অনলাইন যুগে তথ্য ও মতামতের কত দ্রুত বিস্তার ঘটতে পারে। শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্গঠনের একটি অংশ হতে পারে, আবার দেশীয় পরিসরে এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও উত্থাপন করেছে।

শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—বাংলাদেশে সাংবাদিকতা কি কেবল সমালোচনার জায়গা, নাকি তা হতে পারে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যম?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত