১৯ বছর পর সুদান থেকে দেশে ফিরলেন গাইবান্ধার ময়নুল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার
১৯ বছর পর সুদান থেকে দেশে ফিরলেন গাইবান্ধার ময়নুল

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ১৯ বছরের প্রতীক্ষা, অগণিত কষ্ট, আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে অবশেষে। সুদানের যুদ্ধবিধ্বস্ত মাটিতে প্রায় দুই দশক পর বাংলাদেশের এক নাগরিক ফিরে পেয়েছেন নিজের দেশ, পরিবার আর স্বপ্নের আশ্রয়। গাইবান্ধার মো. ময়নুল হক আজ রোববার (২ নভেম্বর) সকালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে নেমেই তাঁর চোখ ভরে ওঠে অশ্রুতে—১৯ বছরের বন্দি জীবনের পর অবশেষে মাটির টানে দেশে ফেরা মানুষের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের নয়।

ময়নুল হক ২০০৬ সালে ঠিকাদারির কাজে সুদানের রাজধানী খার্তুমে যান। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মানুষজন ভেবেছিলেন, বিদেশে গিয়ে তিনি পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। খার্তুমে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ভয় আর অনিশ্চয়তা। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই হারিয়ে ফেলেন নিজের পাসপোর্ট, পরিচয়পত্রসহ সব নথি। দেশে ফেরার পথ তখন বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে।

এরপর শুরু হয় ময়নুলের এক নিঃসঙ্গ, বেদনাময় জীবন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের আবেই নামের এক প্রত্যন্ত এলাকায় আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, কখনও বাজারে, কখনও অন্যের কাজে শ্রম দিতেন। ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য—সবই ছিল অপরিচিত। কিন্তু বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। বছর গড়াতে থাকে, কিন্তু দেশের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই ছিল না। প্রিয়জনরা ভেবে নিয়েছিলেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই।

হঠাৎ করে এ বছরের মে মাসে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ব্যানব্যাট–৩ ইউনিটের একটি টহল দল আবেই এলাকার স্থানীয় বাজারে এক বাংলাদেশির খোঁজ পান। সেনা সদস্যরা তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তিনি গাইবান্ধার বাসিন্দা ময়নুল হক, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে সেখানে আটকে আছেন।

এরপর শুরু হয় তাঁকে দেশে ফেরানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। সেনাবাহিনী বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেয় এবং দ্রুতই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে ইথিওপিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তাঁর জন্য একটি বিশেষ “ট্রাভেল পারমিট” ইস্যু করা হয়। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংগ্রহের পর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাঁর দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়।

রোববার সকালে ঢাকায় পৌঁছানোর পর ময়নুলকে গ্রহণ করেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা। বিমানবন্দরে নামার পর তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমি ভাবতাম, এই জীবনে আর বাংলাদেশে ফিরতে পারব না। আল্লাহর রহমত আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কারণে আজ আমি নিজের মাটিতে পা রাখলাম। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এই মানুষটির পরিবারও ১৯ বছর ধরে দিন গুনছিলেন তাঁর ফেরার আশায়। একপর্যায়ে তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, ময়নুল হয়তো আর বেঁচে নেই। তাই তাঁর দেশে ফেরার খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়তেই যেন উৎসবের আবহ। প্রতিবেশীরা জানায়, তাঁর মা অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু ভাই-বোনেরা এখনও জীবিত। তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না—যে মানুষকে তারা হারিয়ে ফেলেছিলেন, তিনি ফিরে এসেছেন।

স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি ব্যক্তির ফিরে আসা নয়, বরং এক অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, নিঃসঙ্গতা—সব কিছুকে জয় করে একজন মানুষ ফিরে পেয়েছেন নিজের দেশ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ময়নুল হককে উদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের ব্যানব্যাট–৩ ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা শুধুমাত্র তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেনি, বরং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতেও সহায়তা করেছে। সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা শান্তিরক্ষা মিশনে শুধু দায়িত্ব পালন করি না, মানবিক দিক থেকেও সবসময় দেশের মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি। ময়নুল হকের দেশে ফেরাটা সেই মানবিকতারই একটি উদাহরণ।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও জানান, ইথিওপিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও জাতিসংঘের স্থানীয় কার্যালয়ের সহায়তায় বিষয়টি সম্পন্ন হয়। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এরকম আরও আটকে পড়া প্রবাসীদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।

সুদান, বিশেষ করে আবেই অঞ্চলটি বহু বছর ধরেই সংঘাত, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তায় জর্জরিত। সেখানে অবস্থান করা বিদেশি শ্রমিকদের জন্য জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই সেখানে বহু বিদেশি নাগরিক গৃহযুদ্ধের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন বা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে একজন বাংলাদেশির ১৯ বছর পর নিরাপদে দেশে ফেরাকে বড় অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ময়নুল এখন ঢাকায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আছেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তাঁকে গাইবান্ধায় পরিবারের কাছে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে।

দেশে ফিরে তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আমার জীবনের দ্বিতীয় জন্ম দিয়েছে। আমি এখন শুধু চাই, বাকি জীবনটা পরিবারের সঙ্গে শান্তিতে কাটাতে।” তাঁর এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ মানবিক কাহিনির সারমর্ম—যেখানে দেশের মাটির টান, পরিবারের ভালোবাসা আর সেনাবাহিনীর মানবিক উদ্যোগ একসাথে মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনুপ্রেরণার গল্প।

গাইবান্ধার ময়নুল হকের এই দেশে ফেরা শুধু একটি সংবাদ নয়, এটি বাংলাদেশের মানবিক ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও প্রতিফলন। একজন প্রবাসী নাগরিকের জীবনের শেষ প্রান্ত থেকে উদ্ধার হয়ে স্বদেশে ফেরার গল্প হয়তো আরও অনেককে আশার আলো দেখাবে—যে হারিয়ে গেলেও ফেরার পথ একদিন খুলে যায়, যদি কোথাও থাকে মমতা, দায়িত্ববোধ আর দেশপ্রেমের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত