প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু—দেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এক সময় এই প্ল্যাটফর্ম থেকে উঠে এসেছিল জাতির নেতৃত্ব, আন্দোলনের অগ্রদূতরা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডাকসু তার সেই ঐতিহাসিক গুরুত্ব হারাতে বসেছে—এই অভিযোগ অনেকের। এবার সেই অভিযোগের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা রাশেদ খান।
রোববার (২ নভেম্বর) দিবাগত রাতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ডাকসুকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, ডাকসু সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম, কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্র নয়। তাই নির্দিষ্ট কোনো দলকে ‘সংস্কারবিরোধী’ বলে সমালোচনা করা শুধু অন্যায্যই নয়, বরং এই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ চরিত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রাশেদ খান তার পোস্টে লিখেছেন, “রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বা জামায়াত—উভয় দলেরই ভুল থাকতে পারে, ভুল থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ডাকসুর প্যাড ব্যবহার করে একপাক্ষিক বক্তব্য দেওয়া এবং কোনো দলকে সংস্কারবিরোধী আখ্যা দেওয়া অনুচিত। ডাকসু কারও রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যম নয়; এটি দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্ল্যাটফর্ম।
তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর মুহূর্তেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকে তার বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে মন্তব্য করেছেন, আবার কেউ কেউ সমালোচনাও করেছেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছেন।
রাশেদ খান আরও বলেন, “আজকে বিএনপির সমালোচনা করলেন, কিন্তু আগামীকাল জামায়াতের কোনো অপরাধ হলে তখন কি সমালোচনা করতে পারবেন? ডাকসুকে যদি দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়বে। কারণ, যখন একটি সংগঠন নিরপেক্ষতা হারায়, তখন তা আর ছাত্র সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।”
তার বক্তব্যে উঠে আসে একটি স্পষ্ট আহ্বান—ডাকসু যেন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার লড়াইয়ের যন্ত্রে পরিণত না হয়। তিনি বলেন, “ডাকসু সার্বজনীন প্ল্যাটফর্ম হতে চাইলে তাকে গোষ্ঠী স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। কে কোন পদে আছে, কে কোন আদর্শের অনুসারী—সেটি ভুলে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে হবে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “যদি একপাক্ষিক অবস্থান গ্রহণ করা হয়, তাহলে তার পরিণতি হবে বিভাজন, দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ। আর সেই সংঘর্ষ কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়—না শিক্ষার্থীদের জন্য, না দেশের রাজনীতির জন্য।”
তার এই বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত ছিল যে, সাম্প্রতিক সময়ে ডাকসু ও তার প্রতিনিধিরা যেভাবে প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করছেন, তা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই সংগঠনের ঐতিহ্য রাজপথে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে, দলীয় রাজনীতির মাধ্যমে নয়।
রাশেদ খান তার পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, “বিএনপিসহ প্রায় ৪৩টি দল শেখ হাসিনার আমলে সংস্কারের ৩১ দফা দিয়েছে। তখন জামায়াতের কোনো সংস্কার দাবি ছিল না। এখন যদি কেউ বলে, আমরা সংস্কারবিরোধী, তাহলে সেটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
তিনি বলেন, “ধরে নিলাম, ওই ৩১ দফায় আপনার চিন্তা-ভাবনার সব কিছুই অন্তর্ভুক্ত হয়নি, কিন্তু তখন জামায়াত তো একটাও সংস্কারের দফা দেয়নি। এখন প্রশ্ন হলো, কোন সংস্কারের মাধ্যমে ভিসি-ডিসি নিয়োগ ভাগাভাগি করেছেন? এটা শিক্ষার্থীদের জানা দরকার।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাশেদ খান শুধু ডাকসুর নিরপেক্ষতা নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতির মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতি অনেকের কাছে দলীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা এক প্রভাববলয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর প্রায়ই হারিয়ে যায়, আর সেই শূন্যতাই এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার বক্তব্যের মাধ্যমে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশেদ খানের এই মন্তব্য শুধুমাত্র একটি ফেসবুক পোস্ট নয়; বরং এটি ছাত্র রাজনীতির একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন। ডাকসু প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামতকে মূল্য দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে অনেকের চোখে এই প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশেদ খানের মতো তরুণ নেতাদের এই বক্তব্য নতুন প্রজন্মের ছাত্র রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে। তারা মনে করছেন, যদি সত্যিই ডাকসু তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাহলে তাকে দলীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
সামাজিক মাধ্যমে অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীও রাশেদ খানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন। এক শিক্ষার্থী মন্তব্য করেছেন, “ডাকসু যদি সব সময় একটি পক্ষের হয়ে কথা বলে, তাহলে এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নয়, বরং রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠন হয়ে যাবে।” আরেকজন লিখেছেন, “আমরা চাই ডাকসু হোক শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর, কোনো দলের নয়।”
তবে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই ইস্যু নিয়ে মতবিরোধও দেখা দিয়েছে। কিছু ছাত্র সংগঠন বলছে, যারা ডাকসুর কার্যক্রমের সমালোচনা করছেন, তারা মূলত ছাত্র রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করতে চাচ্ছেন। অন্যদিকে, অনেকেই বলছেন, ডাকসুর উচিত নিজের কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা, কথার মাধ্যমে নয়।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাশেদ খান রাজপথে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন এবং ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাই তার বক্তব্যকে অনেকেই গুরুত্ব সহকারে দেখছেন।
তিনি তার পোস্টের শেষাংশে লেখেন, “আমরা যদি নিজের প্ল্যাটফর্মকে স্বচ্ছ রাখতে না পারি, তাহলে জনগণের আস্থা ফিরে পাব কীভাবে? ডাকসুকে দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে, জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির মঞ্চে পরিণত করা আমাদের দায়িত্ব।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, তার এই আহ্বান শুধু ডাকসুর প্রতি নয়—বরং পুরো ছাত্র সমাজের প্রতি একটি বার্তা। সময় এসেছে ছাত্র রাজনীতিকে মুক্ত, গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল ধারায় ফিরিয়ে আনার।
আজকের বাংলাদেশে যেখানে ছাত্র রাজনীতি প্রায়ই সহিংসতা, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় আনুগত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে রাশেদ খানের এই আহ্বান এক নতুন চিন্তার দ্বার খুলে দিতে পারে। তার বক্তব্য হয়তো বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তা অনেকের মধ্যে আশা জাগিয়েছে—ডাকসু আবারও তার হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে পারে, যদি তা সত্যিকার অর্থে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে।