তেলেঙ্গানায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৯, শোকের ছায়া ভারতে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
তেলেঙ্গানায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৯, শোকের ছায়া ভারতে

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তেলেঙ্গানার বিকারাবাদে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সোমবার (৩ নভেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিকারাবাদ–হায়দরাবাদ মহাসড়কের চেভেলায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে ঘটনাস্থলজুড়ে শোক ও বিভীষিকাময় এক নীরবতা নেমে আসে। উদ্ধারকর্মীরা মরদেহগুলো বের করে আনতে থাকেন আর আহতদের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সোমবার সকালটি ছিল অন্য দিনের মতোই। স্থানীয়রা কেউ কাজে যাচ্ছিলেন, কেউ আবার বাজারে বা অফিসে রওনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। মিরজাগুদা থেকে রাঙ্গারেড্ডি জেলার দিকে যাওয়া একটি যাত্রীবাহী বাস প্রায় ৪০ জন যাত্রী নিয়ে হায়দরাবাদগামী ছিল। একই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি পাথরবোঝাই ট্রাক একটি মোটরসাইকেলকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ট্রাকটি সরাসরি বাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, এবং এর পরই ভয়াবহ দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় ট্রাকটি উল্টে যায় এবং ট্রাকে থাকা বিশাল পাথরখণ্ডগুলো গড়িয়ে পড়ে বাসের ওপর। মুহূর্তের মধ্যেই বাসের ছাদ ভেঙে যায়, ভেতরে থাকা যাত্রীরা গুরুতরভাবে চাপা পড়েন।

রাজ্য পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলেই অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে আরও চারজন মারা যান চিকিৎসাধীন অবস্থায়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়রা ও উদ্ধারকর্মীরা মিলে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করে আনতে কাজ শুরু করেন। বাসের সামনের অংশ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়।

দুর্ঘটনার পরপরই বিকারাবাদ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা উদ্ধার অভিযান তদারকি করেন এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রেভান্থ রেড্ডি এক বিবৃতিতে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি আহতদের দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার নির্দেশ দেন। মুখ্যমন্ত্রী টেলেঙ্গানা সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসা খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দেন।

চেভেলা এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দা গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা এক ভয়াবহ শব্দ শুনে দৌড়ে যাই। দেখি বাসটির পুরো ছাদ পাথরের নিচে চেপে গেছে। মানুষ চিৎকার করছে, কেউ বাঁচার জন্য হাত নাড়ছে, কেউ আবার নিথর পড়ে আছে। কয়েকজনকে আমরা জীবিত অবস্থায় বের করতে পারলেও অনেককে তখনই মৃত দেখতে পাই।”

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে তেলেঙ্গানা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আলোচনায় রয়েছে। রাজ্য পরিবহন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরেই তেলেঙ্গানায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশের কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, ক্লান্ত ড্রাইভার এবং ভারী যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলকে দায়ী করা হচ্ছে।

স্থানীয় পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতিতে চলা এবং ওভারটেক করার সময় ড্রাইভারের অসাবধানতাই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ। ট্রাকটি পাথর বোঝাই থাকায় ওজনের কারণে ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যায়, ফলে বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তিনি জানান, ট্রাকের চালকও দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক রাখা হয়েছে।

দুর্ঘটনার খবরে সারা রাজ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিকারাবাদ জেলার হাসপাতালগুলোতে নিহতদের স্বজনদের ভিড় লেগে যায়। শোকাহত পরিবারগুলো কান্নায় ভেঙে পড়েছে। কেউ স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করতে পারছেন না, আবার কেউ হাসপাতালে আশায় প্রহর গুনছেন। হাসপাতালের সামনে অপেক্ষারত এক বৃদ্ধা গণমাধ্যমকে বলেন, “আমার ছেলে সকালে কাজের জন্য বাসে উঠেছিল। এখন জানি না সে বেঁচে আছে কি না। কেউ কিছু বলছে না।”

এই দুর্ঘটনা শুধু একটি রাজ্য নয়, গোটা ভারতের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নটিকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে প্রতি বছর গড়ে দেড় লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এর বড় অংশের কারণ অনিয়ন্ত্রিত ট্রাক চলাচল, খারাপ রাস্তা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব। তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলোতে শিল্প-কারখানা ও নির্মাণ প্রকল্প বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভারী যানবাহনের চাপও বেড়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি সেভাবে।

রাজ্য পরিবহন দপ্তর ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে ট্রাক ও বাসের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, ট্রাকটির মালিক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী, যিনি নিয়মিত পাথর সরবরাহের কাজ করেন। তবে চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল কিনা, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।

দুর্ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা একে একে শোকবার্তা দিয়েছেন। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এ ধরনের দুর্ঘটনা আমাদের সবাইকে নিরাপত্তার গুরুত্বের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।”

চেভেলার দুর্ঘটনা ভারতের সড়ক নিরাপত্তার দুর্বল বাস্তবতার আরেকটি নির্মম দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। প্রতিদিন হাজারো মানুষ কাজের প্রয়োজনে রাস্তায় নামে, কেউ আর ফিরে আসে না। বিকারাবাদের সেই রক্তাক্ত মহাসড়কে আজও ছড়িয়ে আছে পাথর, ধ্বংসস্তূপ আর শোকাহত মানুষের ক্রন্দন। এক মুহূর্তের অসাবধানতা যে কত পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়, তার সাক্ষী হয়ে আছে চেভেলার এই নিস্তব্ধ সকাল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত