প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রার্থী হতে পারেন, যদি তিনি এবং চীন ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে যৌথভাবে কাজ করেন—এমন মন্তব্য করেছেন চীনের প্রভাবশালী নীতি-উপদেষ্টা হেনরি হুয়াও ওয়াং। তিনি এই মন্তব্য করেন ইস্তাম্বুলে আয়োজিত নবম টিআরটি ওয়ার্ল্ড ফোরামের এক সাক্ষাৎকারে। এ বিষয়ে সোমবার (৩ নভেম্বর) তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
হেনরি হুয়াও ওয়াং চীনের নীতি-নির্ধারণী একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত। তিনি সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন (সিসিজি)-এর প্রতিষ্ঠাতা। সাক্ষাৎকারে তিনি জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব তুলে ধরেন, যেখানে ইউক্রেনে একটি যৌথ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করার কথা বলা হয়েছে। এই শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অবদান রাখবে শুধু পশ্চিমা দেশই নয়, বরং তুরস্ক, চীন, ভারত, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উদীয়মান শক্তিগুলিও। হুয়াও ওয়াং এর মতে, এটি একটি বহুজাতিক শান্তি উদ্যোগের সূচনা হতে পারে যা ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সক্ষম।
ওয়াং বলেন, “জাতিসংঘের পি-৫ সদস্যদের মধ্যে বৃহত্তম শান্তিরক্ষী সৈন্য প্রেরণকারী হিসেবে চীন এবং ভারত উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এছাড়া অন্যান্য ব্রিকস দেশগুলোও সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। এই যৌথ উদ্যোগ ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি স্থাপন করতে সাহায্য করবে।”
হুয়াও ওয়াং তুরস্ককে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “তুরস্ক ইতিমধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনার আয়োজন করেছে এবং ‘ল্যান্ডমার্ক ব্ল্যাক সি গ্রেন ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা পুনরায় একটি বৃহত্তর বহুজাতিক শান্তিরক্ষা মিশনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন এই বিষয়ে একসাথে কাজ করে, তাহলে ট্রাম্প আগামী বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদারও হতে পারেন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং মানবতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।”
হুয়াও ওয়াং এর বক্তব্যের আলোকে দেখা যায় যে, তিনি মার্কিন ও চীনের মধ্যে ইতিবাচক সংলাপকে একটি যৌথ শান্তি উদ্যোগে রূপান্তরের সম্ভাবনার কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, “চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং ট্রাম্পের মধ্যে সম্প্রতি বুসান শীর্ষ সম্মেলনে যে সংলাপ হয়েছে, সেখানে ইউক্রেন সংঘাত নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সংলাপকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তরিত করা।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুয়াও ওয়াং-এর প্রস্তাব এক ধরনের বহুজাতিক কূটনৈতিক সমাধান হতে পারে যা ইউক্রেন যুদ্ধে স্থায়ী শান্তি আনার সম্ভাবনা রাখে। এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে এটি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ স্থাপন করবে।
বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে এমন বহুজাতিক উদ্যোগ বিরল। তবে হুয়াও ওয়াং মনে করেন, এটি বাস্তবায়নযোগ্য যদি বড় শক্তিগুলো পারস্পরিক বিশ্বাস ও কূটনৈতিক সহমতের ভিত্তিতে কাজ করে। তিনি বলেন, “শান্তি অর্জনের জন্য কোনো দেশই একা এগোতে পারবে না। বহু দেশের যৌথ প্রচেষ্টা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প ও চীনের যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়নযোগ্য হলে, সেটি নিঃসন্দেহে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য হতে পারে।”
সাক্ষাৎকারে হুয়াও ওয়াং আরও বলেন, “ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষদের ভোগান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও সাধারণ নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই যৌথ শান্তি উদ্যোগ কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি মানবিক কারণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
এছাড়া, তিনি জানান, বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বহুজাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনীকে সুসংগঠিত করা অপরিহার্য। “এই বাহিনী যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, যার মধ্যে থাকবে সৈন্যদের নৈতিক আচরণ ও মানবাধিকার রক্ষার দিকগুলো নিশ্চিত করার একটি কাঠামো। এটি শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, স্থায়ী শান্তির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুয়াও ওয়াং-এর মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো বৃহৎ শক্তির মধ্যে যৌথ উদ্যোগ শান্তি প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে পারে এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে পথ সুগম করতে পারে।
সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, হুয়াও ওয়াং-এর প্রস্তাবনা এবং ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার সম্ভাবনা শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থায়িত্বের দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ প্রলম্বিত প্রেক্ষাপটে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।