প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় রাজনীতির অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ে দেশবাসী যখন ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগে, তখন আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতানৈক্য স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন বিরোধে রূপ না নেয়—এটাই এখন সময়ের দাবি।
মঙ্গলবার ভোরে দুই সপ্তাহব্যাপী বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সরকারের অনুরোধে রাজনৈতিক দলগুলো বসে সংস্কার নিয়ে যে আলোচনার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তা জাতির স্বার্থে অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। “আমরা সবসময় আলোচনা ও ঐক্যের পক্ষে। আমাদের মধ্যে মতানৈক্য থাকতেই পারে, তবে মতবিরোধ যেন জাতিকে বিভক্ত না করে। দেশের জন্য সবাইকে একসঙ্গে বসে সমাধানের পথ বের করতে হবে,” বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে জানান, জামায়াত সবসময় দেশের সার্বিক কল্যাণের রাজনীতি করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তিনি বলেন, “আমরাই প্রথম সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছি যেন দেশ ও জনগণের স্বার্থে দলগুলো খোলামেলা আলোচনায় বসে। সরকার সেই উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমরা স্বাগত জানাই এবং আশা করি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাস্তব কোনো অগ্রগতি দেখা যাবে।”
বিএনপির প্রার্থী তালিকা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, “আমি শুনেছি বিএনপি ২৩৭টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এটি তাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি মাত্র, চূড়ান্ত নয়। আমরাও প্রায় এক বছর আগে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করেছি। তবে আমরা একা নির্বাচন করব না। তাই যৌথ সিদ্ধান্তের ওপরই চূড়ান্ত তালিকা নির্ভর করবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, যাতে দেশ একটি স্থায়ী সরকার ও স্থিতিশীলতা পায়।”
বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, গত ১৯ অক্টোবর তিনি পবিত্র ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব যান। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তুরস্ক সফর করেন। “যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আমার ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। নিউইয়র্ক, বাফেলো ও ওয়াশিংটনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেখা করেছি, তাদের মতামত শুনেছি,” বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান জানান, তুরস্কেও তিনি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। “আমি যেখানে গিয়েছি, সব জায়গায় দেশের স্বার্থই প্রাধান্য দিয়েছি। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট—আমরা দুনিয়ার সবার সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক চাই। এ সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে,” বলেন জামায়াত আমির।
প্রবাসীদের প্রতি বিশেষ বার্তা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের সবার। ফ্যাসিবাদ থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে, এখন সময় গণতান্ত্রিক ঐক্যের। প্রবাসীদেরও এই মুক্তি ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রয়েছে। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।” তিনি নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “তারা প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়ে গেছে। অক্টোবরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত সময় সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকে ভোটার হতে পারেননি। আমরা চাই এই সময় অন্তত ১৫ দিন বাড়ানো হোক এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা হোক।”
জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, “আমরা চাই প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও দেশের অংশীদার হোক। জাতীয় সংসদ ও সরকার পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ সংখ্যানুপাতে নিশ্চিত করা হবে। কারণ, তারা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় অমূল্য অবদান রাখছেন।”
সাংবাদিকদের উদ্দেশে জামায়াত আমির গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “আপনারা জাতির বিবেক, আর মিডিয়া সমাজের দর্পণ। আপনারা শুধু সংবাদকর্মী নন, এই দেশের নাগরিকও বটে। আমরা যেই মানবিক, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, তাতে আপনাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।”
এই সময় জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, অধ্যাপক শাহজাহান চৌধুরী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আব্দুল হালিম, হামিদুর রহমান আযাদসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে বের হলে উপস্থিত নেতাকর্মীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। ব্রিফিং শেষে তিনি গাড়িবহরসহ বসুন্ধরার বাসভবনের পথে রওনা দেন। সেখানে পৌঁছালে কর্মীরা তাকে ঘিরে স্লোগান দেন, “দেশ চাই ঐক্যে, নয় বিভক্তিতে।”
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য নতুন এক ইতিবাচক বার্তা বয়ে এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন ও পরস্পর অবিশ্বাসের পরিবেশে এই আহ্বান যদি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
জাতীয় স্বার্থে এক টেবিলে বসে সংকট সমাধানের এই বার্তা শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য এক শান্তি ও স্থিতিশীলতার আশার আলো জ্বালায়—যেখানে মতের ভিন্নতা নয়, বরং ঐক্যই হবে ভবিষ্যতের পথনির্দেশ।










