আদানি–বিপিডিবি বিদ্যুৎ বিল বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশিতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬১ বার
আদানি–বিপিডিবি বিদ্যুৎ বিল বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশিতে

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ এবং চুক্তির শর্ত পালন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান মতবিরোধ এবার আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক সালিশি পর্যায়ে গড়াচ্ছে। ভারতের বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তি করতে তারা আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও জ্বালানি উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান নিশ্চিত করেছেন, আলোচনার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সালিশিতে যাওয়া হবে। এতে স্পষ্ট যে দুই পক্ষই বিরোধের পথ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাধানের দিকে এগোচ্ছে।

বিপিডিবি ও আদানির মধ্যে এই বিরোধের সূত্রপাত ২০১৭ সালে সই হওয়া ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি থেকে। ওই চুক্তির আওতায় ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে। বর্তমানে কেন্দ্রটি বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় এক–দশমাংশ পূরণ করে। প্রথমদিকে এই প্রকল্প দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্য নির্ধারণ, কর ছাড় সুবিধা এবং খরচ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ভারতের এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটি কর–ছাড় সুবিধা পেয়েছে, যা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে সমভাবে দেওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে বিদ্যুতের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে বলে দাবি করে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ওঠে হিসাব স্বচ্ছতা ও বিল তৈরির পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেন, আদানি প্রকল্পে ব্যবহৃত কয়লার দাম আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় বেশি ধরা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎমূল্য বাড়িয়েছে।

২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ আদানি পাওয়ার প্রকল্প থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনেছে ১৪.৮৭ টাকা দরে, যেখানে অন্যান্য ভারতীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ৯.৫৭ টাকা। এই তফাৎ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি যাচাই করে দেখা হলে বৈষম্য ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ সামনে আসে।

এছাড়া দেশে জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপও বিরোধকে আরও প্রখর করে তোলে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, কিছু সময় আগে আদানি পাওয়ারের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। যদিও পরবর্তীতে দ্রুত অর্থপ্রদানের মাধ্যমে এই বকেয়া কমিয়ে আনা হয়। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, এখন বকেয়া বিল নামিয়ে আনা হয়েছে ১৫ দিনের ট্যারিফ সমপরিমাণে, যা তুলনামূলকভাবে বড় অগ্রগতি হলেও দ্বন্দ্ব পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।

আদানি গ্রুপের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল বিরোধ চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের হিসাব প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। কোম্পানিটি স্পষ্ট জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সালিশিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। তাদের আশা, সালিশি প্রক্রিয়াই দ্রুত, কার্যকর এবং উভয় পক্ষের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান এনে দেবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা ‍জানান, আলোচনার পথ এখনো শেষ হয়নি; তবে প্রয়োজনে সালিশিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশও এই বিরোধের বিষয়ে কৌশলগত অবস্থান নিয়ে এগোচ্ছে।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দেশের জ্বালানি খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং বিদ্যুৎ নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক সালিশিতে যাওয়া অতীত অভিজ্ঞতায় কখনোই সহজ বা স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া নয়। বড় অঙ্কের আর্থিক দাবি ও প্রতিদাবি, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং কৌশলগত অবস্থান—এসবই একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই সিদ্ধান্ত কেবল ব্যবসায়িক বা আর্থিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিতে যদি সত্যিই মূল্য নির্ধারণের বৈষম্য বা কর সুবিধায় অসামঞ্জস্য থাকে, তবে তা শুদ্ধি আনার ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক সুযোগ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ চুক্তিতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয় এই ঘটনায়। তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বিরোধ দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তাই সমাধান অবশ্যই হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভাবনায় থাকবে বিদ্যুতের সরবরাহ ও মূল্য। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ইতিমধ্যে ব্যয়বহুল আমদানি, উচ্চ উৎপাদন খরচ ও মুদ্রার চাপ মোকাবিলা করছে। লোডশেডিং ও জ্বালানি খাতে হস্তান্তরযোগ্য ঋণ–চাপ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এই অবস্থায় যে কোনো বিরোধ বিদ্যুৎ সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—সে আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই সমাধানের রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে।

এখন প্রশ্ন—এই বিরোধের ফলাফল কী হতে পারে? আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়া সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং তার রায়ও উভয় পক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক হয়। যদি সালিশি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের দাবিগুলো প্রমাণিত হয়, তাহলে চুক্তির স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত হবে। কিন্তু যদি বিপরীত ফল আসে, তাহলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক দায় সৃষ্টি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দায়িত্ব হবে আলোচনার পথ সচল রাখা এবং সালিশির পাশাপাশি কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক সমাধান অনুসন্ধান করা। কারণ, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্বাস ও সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সম্পদ। অন্যদিকে আদানি গ্রুপের মতো বৈশ্বিক কোম্পানিরও উচিত গ্রাহক দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চুক্তির নৈতিক ভিত্তিকে সম্মান জানানো।

সবশেষে বলা যায়, আদানি–বিপিডিবি বিরোধ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বাস্তবতা ও জ্বালানি চুক্তির কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেবে। দেশের জনগণ ইতোমধ্যেই উচ্চমূল্য, মুদ্রাচাপ ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। তাই এই বিরোধ শুধু দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি কৌশল ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। স্বচ্ছ আলোচনা, আইনি পদ্ধতি ও ন্যায্যতার মধ্য দিয়ে এর সমাধানই এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।

বাংলাদেশ আশা করছে, এই বিরোধ দ্রুত এবং উভয় দেশের স্বার্থ–রক্ষাকারী পথে নিষ্পত্তি হবে। কারণ, প্রতিবেশী দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতা শুধু বিদ্যুৎ বিনিময় নয়—এটি আঞ্চলিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক আস্থার প্রতীকও বটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত