প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিয়ে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তাদের মতে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ছাড়া জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা বিপ্লবের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের রক্ত ও ত্যাগকে মর্যাদা দিতে হলে নির্বাচনের আগে গণভোট বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সনদকে সংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। অন্যথায়, বিপ্লবের চেতনা ও অর্জন দুটোই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে শহীদ ও আহতদের পরিবারগুলো এই দাবি তোলেন। শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা আলহাজ শহিদুল ইসলাম ভুঁইয়া লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এতে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জুলাই বিপ্লব দেশের জনগণের আত্মত্যাগে অর্জিত এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হয়েছিল, কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই বিপ্লবের মূল প্রতিশ্রুতি—জুলাই সনদের বাস্তবায়ন—এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে।
শহিদুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, “জুলাই বিপ্লবের প্রথম কাজই ছিল জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। কিন্তু সেটি এখনো হয়নি। এটি শুধু আমাদের পরিবারের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্যই অপমানের। আমার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আজও সনদের জন্য সংবাদ সম্মেলন করতে হচ্ছে—এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা চাই নির্বাচনের আগেই গণভোটের মাধ্যমে সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়া হোক।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অন্য শহীদ পরিবারের সদস্যরাও একই দাবি জানান। শহীদ মীর মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর বলেন, “স্বাধীনতার পর যে আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি, তাই জুলাই বিপ্লব হয়েছিল। আমরা চাই না আবার সেই অবস্থায় ফিরতে। স্বৈরাচার হাসিনার পতনের মাধ্যমে প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হলেও এখনই সময় সনদ বাস্তবায়নের। মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে এবং নতুন প্রজন্মকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে।”
শহীদ আফিকুল ইসলাম সাদের বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, “বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল সনদ বাস্তবায়নের। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনার পরও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচনে ব্যস্ত, কিন্তু বিপ্লবের চেতনাকে ভুলে গেছে। আমরা চাই, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হোক, নইলে এই বিপ্লবের ইতিহাস হারিয়ে যাবে।”
শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের মা কাজী লুলুল মাহমিন বলেন, “আমরা সন্তান হারিয়েছি দেশের জন্য, কিন্তু এখনও আইনি স্বীকৃতি পাইনি। আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে, অনেকেই অবহেলার শিকার। রাজনৈতিক নেতারা বিদেশে যাবেন, অথচ আমরা কোথায় যাব? সনদের আইনি স্বীকৃতি না পেলে এই বিপ্লবের কোনো মানে থাকবে না।”
শহীদ মাহমুদুর রহমান খানের স্ত্রী মরিয়ম খানম বলেন, “তিন সন্তান নিয়ে এখন বেঁচে আছি। আমি নিরাপত্তা চাই, সুরক্ষা চাই। নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশ বা গণভোট—যেভাবেই হোক, সনদের আইন ভিত্তি দিতে হবে।”
এ সময় শহীদ মো. আব্দুল হান্নান খানের ছেলে ড. সাইফ আহমেদ খান বলেন, “স্বৈরাচারের পতনের সময় কত তরুণ বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে। এখন তাদের পরিবার আইনি সুরক্ষা পাচ্ছে না। আমি চাই, জুলাই সনদ দ্রুত সংবিধানে যুক্ত করা হোক। এতে শহীদ পরিবারগুলো নিরাপত্তা পাবে, আর বিপ্লবের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।”
শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, “বর্তমান সরকার এক বছরের বেশি সময় ধরে সনদ বাস্তবায়নের কথা বলে আসছে, কিন্তু এখনও কোনো ফল নেই। এখন সবাই নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। দেশের পরিস্থিতি আগের মতোই চলছে। মুদ্রার পিঠ-ওপিঠ—কোনো পরিবর্তন নেই। নিশ্চয়ই আমাদের সন্তানরা এই অবস্থার জন্য জীবন দেয়নি।”
শহীদ ইয়ামিনের বাবা মো. মহিউদ্দিন বলেন, “স্বৈরাচার পতনের পর দুই বড় রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কিন্তু সনদ বাস্তবায়নে কেউ আন্তরিক নয়। আমরা চাই, জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কোটার দাবি নয়, অন্তত একবারের জন্য হলেও তাদের মর্যাদা দিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই সনদ নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন না হলে সেটির কোনো মূল্য থাকবে না। আগে সনদ, পরে নির্বাচন—এটাই জনগণের দাবি। অন্যথায় নতুন করে দেশকে অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।”
শহীদ সৈয়দ মুনতাসীর রহমান আলিফের বাবা সৈয়দ গাজীউর রহমান বলেন, “আমার ছেলে দেশের জন্য নিজের জীবন দিয়েছে, কিন্তু আজও বিচার হয়নি। এত সভা-সম্মেলন হচ্ছে, কিন্তু শহীদ পরিবারের কাছে কেউ আসে না। নির্বাচনের আগে সনদ বাস্তবায়ন না হলে কিছুই বদলাবে না। আমরা চাই বিচার, সংস্কার এবং তারপর নির্বাচন।”
সংবাদ সম্মেলনের শেষ অংশে শহীদ পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বলেন, “জুলাই বিপ্লবের রক্ত বৃথা যাবে না। এই বিপ্লব আমাদের আত্মত্যাগের, স্বাধীনতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা। সনদকে আইনি মর্যাদা না দিলে সেই ইতিহাস হারিয়ে যাবে। তাই নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।”