প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন জোহরান মামদানি। আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম মুসলিম মেয়র, ১৮৯২ সালের পর শহরের সর্বকনিষ্ঠ প্রশাসক—সব মিলিয়ে তিনি এখন এক বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তার বিজয় শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং প্রতীকীও—এক তরুণ, অভিবাসী বংশোদ্ভূত, স্বল্প অর্থ ও দলীয় সমর্থন ছাড়াই জনতার আস্থা অর্জন করেছেন। কিন্তু বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি তার সামনে এখন একের পর এক বাস্তব চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে, যা এই মুহূর্তে আমেরিকার বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎও অনেকটা নির্ধারণ করে দেবে।
গত বছর প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ছাড়াই রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করেছিলেন মামদানি। সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস সিলওয়ার মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পরাজিত করে তিনি দেখিয়েছেন, জনগণের আস্থা দলীয় যন্ত্রের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তার এই উত্থান অনেক বিশ্লেষকের কাছে “বামপন্থার পুনর্জাগরণ” হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
তবে বিজয়ের পরেই তাকে ঘিরে শুরু হয়েছে অন্য বাস্তবতার অধ্যায়। নিউইয়র্কের মতো জটিল ও বহুমাত্রিক শহর পরিচালনা সহজ কাজ নয়। ইতিহাস বলছে, এই পদে অনেক জনপ্রিয় নেতাও ব্যর্থতার মুখ দেখেছেন। বারো বছর আগে বিল ডি ব্লাসিওও একই রকম আশার প্রতীক হয়ে মেয়র হয়েছিলেন, কিন্তু আট বছরের ব্যবধানে তার জনপ্রিয়তা ম্লান হয়ে যায়; প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক বাস্তবতা তার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। মামদানিকেও এখন একই সীমাবদ্ধতার ভেতরেই নিজের জায়গা তৈরি করতে হবে।
মামদানির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা উচ্চাভিলাষী। তিনি বিনামূল্যে শিশু যত্ন, গণপরিবহন সম্প্রসারণ ও সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর পক্ষে। তবে নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুল ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, কর বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপে তিনি সমর্থন দেবেন না। এতে স্পষ্ট হয়েছে, মেয়রের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনীয় অর্থ ও কর্তৃত্ব ছাড়া তার অনেক উদ্যোগই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
একই সঙ্গে মামদানির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি কর্পোরেট অভিজাতদের তীব্র সমালোচনা করেছেন, ম্যানহাটনের আর্থিক এলিটদের স্বার্থবিরোধী নীতির কথা বলেছেন। এখন তাকে সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে বাস্তবিক সমঝোতা তৈরি করতে হবে, কারণ নিউইয়র্কের অর্থনৈতিক কাঠামোর বড় অংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে। শাসনের বাস্তবতা প্রায়ই আদর্শবাদকে সংযত করে; মামদানি এই ভারসাম্য কতটা রক্ষা করতে পারেন, সেটিই তার নেতৃত্বের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে।
তার আন্তর্জাতিক অবস্থানও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গাজা যুদ্ধ নিয়ে তিনি ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনা করেছেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক সফরে এলে তাকে “যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গ্রেপ্তারের” আহ্বান জানিয়েছেন। এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে যদি এই প্রশ্ন আবার সামনে আসে, তবে সেটি তার প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উভয় চাপের কারণ হতে পারে।
এখন মামদানিকে নিজেকে জনগণের চোখে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় মনোযোগ আকর্ষণ করলেও, সিবিএসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী প্রায় অর্ধেক আমেরিকানই নিউইয়র্কের নির্বাচন খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করেননি। অর্থাৎ, আমেরিকার বিশাল অংশের কাছে তিনি এখনও এক “অলিখিত ক্যানভাস”—যা তার জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি ঝুঁকিও।
প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রক্ষণশীল রাজনীতিকরা ইতিমধ্যেই তাকে “সমাজতান্ত্রিক হুমকি” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, মামদানির নীতি শহরের অর্থনৈতিক স্থিতি নষ্ট করবে এবং তার সাফল্য সারাদেশে বিপজ্জনক উদাহরণ তৈরি করবে। তাই তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের আওতায়। এমনকি নিউইয়র্কে অপরাধের পরিসংখ্যান বাড়লে বা অর্থনৈতিক সূচক দুর্বল হলে, তার বিরোধীরা সেটিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে—এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে তার কিছু সুবিধাও আছে। প্রথমত, তার অতীতের কোনো বড় বিতর্ক বা স্ক্যান্ডাল নেই, যা প্রচারণায় প্রতিপক্ষ ব্যবহার করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তার তরুণ নেতৃত্বের প্রতীকী শক্তি—যা নিউইয়র্কের মতো শহরে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আগ্রহকে উজ্জীবিত করেছে। তিনি রাজনীতির ভাষাকে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রজন্মের কাছে সহজ ও মানবিক করে তুলেছেন। তার প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রবিন্দু “মানুষ” — শ্রমজীবী, অভিবাসী, এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
তবু প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ এখানেই শেষ নয়। নিউইয়র্কে মেট্রো অবকাঠামো থেকে শুরু করে আবাসন সংকট, অপরাধ দমন, গৃহহীনতা ও জলবায়ু ঝুঁকি—সবই তার দায়িত্বের অংশ। একই সঙ্গে তাকে এক বহুমাত্রিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা সামাল দিতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য যেমন গভীর, তেমনি রাজনৈতিক বিভাজনও তীব্র।
বিশ্লেষকদের মতে, মামদানির মেয়াদকাল মার্কিন রাজনীতিতে বামধারার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি তিনি বাস্তবতার সীমারেখার মধ্যে থেকেও সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন, তবে তা জাতীয় পর্যায়ে বামপন্থী রাজনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। কিন্তু যদি ব্যর্থ হন, তবে সেটি মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য এক বড় ধাক্কা হয়ে আসবে।
তবে আপাতত ডেমোক্র্যাটরা আশাবাদী। বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে বাম ও মধ্যপন্থি উভয় প্রার্থীই সাফল্য পেয়েছেন। মামদানিও বলেছেন, তার দলটি এমন হওয়া উচিত যেখানে সব মতের মানুষ নিজেদের প্রতিফলিত দেখতে পাবেন—একটি দল যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক শ্রেণির প্রতিচ্ছবি নয়, বরং সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
জানুয়ারিতে যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন, তখন শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়। তার সামনে থাকবে নিউইয়র্ককে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও মানবিক শহরে রূপান্তরের অঙ্গীকার। কিন্তু সেই পথে রয়েছে বহু বাধা—রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্য রক্ষা।
জোহরান মামদানির রাজনৈতিক যাত্রা এখন এক সংকটের মোড়ে। ইতিহাসে নাম লেখানো সহজ, কিন্তু ইতিহাসে টিকে থাকা অনেক কঠিন। আগামী বছরগুলোই বলে দেবে—তিনি কি আদর্শের রাজনীতিকে বাস্তব শাসনে রূপ দিতে পারেন, নাকি নিউইয়র্ক সিটির রূঢ় বাস্তবতাই তাকে বদলে দেবে।