প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে টেস্ট ফরম্যাট যেন দিন দিন দূর স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। টি-টোয়েন্টির ঝলমলে জোয়ারে যখন বিশ্ব ক্রিকেটের দৃষ্টি সীমিত ওভার ফরম্যাটে, তখন টেস্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিম্নগামী। গত ১৪ মাসে লাল-সবুজ জার্সিতে দশটি টেস্ট খেললেও পারফরম্যান্সে দেখা গেছে চরম অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে ব্যাট হাতে। একের পর এক ব্যর্থতা, ভঙ্গুর টপ অর্ডার, ছোট ছোট জুটি আর অচল রান মেশিন—সব মিলিয়ে টেস্টে বাংলাদেশ এখন গভীর দুশ্চিন্তার নাম।
টেস্ট ক্রিকেটে এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ ম্যাচ খেলেছে ভারত, যেখানে বাংলাদেশ খেলেছে চতুর্থ সর্বোচ্চ ১০টি। কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে থেকেও পারফরম্যান্সের গ্রাফ নিচের দিকেই। এই দশ ম্যাচে নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বাধীন দল জিতেছে মাত্র দুটি টেস্ট। বাকিগুলো হার কিংবা নিষ্প্রভ ড্রয়ের গল্প। এমন ব্যর্থতায় একটিও টেস্ট সিরিজ জয় পায়নি বাংলাদেশ।

টেস্টের ইতিহাসে এমন সময় খুব কমই এসেছে, যখন বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার এতটা দুর্বল ও আত্মবিশ্বাসহীন মনে হয়েছে। শেষ ১৪ মাসে দলের হয়ে ব্যাট হাতে সবচেয়ে বেশি রান করা ক্রিকেটার নাজমুল হোসেন শান্ত—তিনি ৮ টেস্টে ১৫ ইনিংসে ৪৬ গড়ে করেছেন ৬৫০ রান। দুটি সেঞ্চুরি ও দুটি হাফ সেঞ্চুরির বাইরে তাঁর ব্যাট থেকেও এসেছে দীর্ঘ সময়ের নীরবতা।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করেছেন ওপেনার সাদমান ইসলাম—৫১২ রান, যার মধ্যে রয়েছে একটি সেঞ্চুরি ও তিনটি হাফ সেঞ্চুরি। মমিনুল হক, একসময়ের টেস্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে খ্যাত, শেষ ১০ টেস্টে ছিলেন নিয়মিত, কিন্তু ১৯ ইনিংসে ২৬ গড়ে করেছেন মাত্র ৪৮৪ রান। একসময় যিনি বাংলাদেশের টেস্ট ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ছিলেন, এখন তাঁর ব্যাটেই নেমে এসেছে নীরবতা।
মুশফিকুর রহিমের অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। শেষ ৮ টেস্টে তাঁর মোট রান ৪৩৬, গড় মাত্র ২৯। করেছেন মাত্র একটি সেঞ্চুরি। আর ব্যাট হাতে অন্যতম ভরসা হিসেবে বিবেচিত লিটন দাসও টেস্টে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন—৭ ম্যাচে রান মাত্র ২৭৪, গড় ১৯। এমন পারফরম্যান্সে বোঝাই যাচ্ছে, ব্যাটিং লাইনআপের অবস্থা কতটা দুর্বল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান হলো—শেষ ১৪ মাসে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ২০০ বা তার বেশি রান করেছেন মাত্র ৭ জন ক্রিকেটার, অথচ এই সময়ের মধ্যে মোট ২২ জন খেলোয়াড় টেস্টে অংশ নিয়েছেন। অর্থাৎ, একাদশে জায়গা পেয়েও বেশিরভাগ ব্যাটার কোনো অবদান রাখতে পারেননি।
দীর্ঘদিন ধরেই ওপেনিং জুটি বাংলাদেশের জন্য একটি অমীমাংসিত সমস্যা। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে সাদমান ইসলামের সঙ্গী হিসেবে দেখা যেতে পারে মাহমুদুল হাসান জয়কে। কিন্তু জয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও আশাব্যঞ্জক নয়—শেষ ৫ ম্যাচে ১০ ইনিংসে তাঁর মোট রান মাত্র ১৫২। কোনো ফিফটি বা সেঞ্চুরি নেই। টেস্টে এমন দুর্বল সূচনা দলকে সব সময়ই ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়, আর সেটিই ঘটছে বারবার।
একটি শক্তিশালী টেস্ট দল গড়ে ওঠে বড় জুটির ওপর ভর করে। কিন্তু সেই জায়গাতেও বাংলাদেশের ব্যর্থতা স্পষ্ট। শেষ ১৪ মাসে ১০ টেস্টে বাংলাদেশ মাত্র ছয়বার শতরানের জুটি গড়তে পেরেছে। ওপেনিংয়ে মাত্র একবার, চতুর্থ উইকেটে দুইবার, আর পঞ্চম, সপ্তম ও নবম উইকেটে একবার করে। এটি শুধু ব্যাটিং দুর্বলতার প্রমাণ নয়, বরং দলের মানসিক দৃঢ়তারও ঘাটতি নির্দেশ করে।
টেস্টে ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ধৈর্য ও স্থিতিশীলতা না থাকলে বড় ইনিংস তৈরি হয় না, যা বর্তমান দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
যদিও ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ ব্যর্থতার গল্প লিখেছে, বোলাররা কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। শেষ ১৪ মাসে ২০ বা তার বেশি উইকেট শিকার করেছেন মাত্র তিনজন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে তাইজুল ইসলাম ছিলেন সবচেয়ে কার্যকর। ৯ ম্যাচে তাইজুলের শিকার ৪২ উইকেট, পাঁচবার পেয়েছেন ফাইভ-উইকেট হাল। টেস্টে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি ধীরে ধীরে সেরা স্পিনার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করছেন।
মেহেদি হাসান মিরাজও ছিলেন নিয়মিত ধারাবাহিক। সমান সংখ্যক ম্যাচে ৩১ উইকেট শিকার করেছেন এই অলরাউন্ডার। তবে পেসারদের পারফরম্যান্স তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। হাসান মাহমুদ ২০ উইকেট নিয়ে তালিকায় তৃতীয়, কিন্তু তাঁর পরে নামগুলো আশাব্যঞ্জক নয়। নিয়মিত না খেলেও তাসকিন আহমেদ নিয়েছেন ১৫ উইকেট এবং তরুণ নাহিদ রানা ৬ ম্যাচে ১৩ উইকেট। নাঈম হাসানও ১২ উইকেট পেয়েছিলেন, কিন্তু এবার স্কোয়াডে জায়গা পাননি।
বোলারদের মধ্যে তাইজুল ও মিরাজের মতো কয়েকজন যদি ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করতে পারেন, তাহলে দল অন্তত টেস্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
আয়ারল্যান্ড সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটারদের সঙ্গে কাজ করছেন নতুন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। একসময় নিজেই ছিলেন দেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটারদের একজন। এখন দায়িত্ব তাঁর, ভাঙা আত্মবিশ্বাসের ব্যাটারদের মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘ ইনিংস খেলার মানসিকতা তৈরি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা টেকনিক নয়, বরং মনোযোগের ঘাটতি ও মানসিক দুর্বলতা। ব্যাটাররা সময়ের সঙ্গে নিজেদের খেলায় দৃঢ়তা আনতে না পারলে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়বে।

ঘরের মাঠে আয়ারল্যান্ডকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়ে বাংলাদেশ অনেকেই ভেবেছেন সহজ সিরিজ অপেক্ষা করছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০১৮ সালে টেস্ট অভিষেকের পর আয়ারল্যান্ড ১০টি টেস্ট খেললেও প্রতিটি ম্যাচে তারা লড়াই করেছে। অন্যদিকে ২০০০ সাল থেকে টেস্ট খেলা বাংলাদেশ ১৫৪ ম্যাচে অভিজ্ঞতা অর্জন করেও ধারাবাহিকতা গড়তে পারেনি।
এবারের লড়াই তাই শুধুই প্রতিপক্ষের সঙ্গে নয়—নিজেদের সঙ্গেও। শান্ত-মিরাজ-মুশফিকদের সামনে বড় সুযোগ নিজেদের প্রমাণ করার, ব্যাট হাতে লড়াই ফিরিয়ে আনার।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট এখন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে—যেখান থেকে হয় ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, না হলে আরও নিচে নামতে হবে। ব্যাটিং অর্ডারের এমন হতশ্রী পারফরম্যান্সে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শুধু জয়ের লড়াই নয়, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সংগ্রামও বটে।
তাইজুল-মিরাজদের ঘূর্ণি, নতুন কোচ আশরাফুলের পরিকল্পনা, আর শান্তর নেতৃত্ব—সবকিছু মিলিয়ে সামনে যদি বাংলাদেশ ব্যাটিং ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে পারে, তবেই টেস্ট ক্রিকেটে নতুন সূচনা সম্ভব। অন্যথায় এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার রাত আরও দীর্ঘ হবে।