প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দল এখনো নিজেদের স্বপ্নযাত্রার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে লিওনেল স্কালোনির দল ভবিষ্যতের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে নভেম্বর মাসে ইউরোপ সফরে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে তারা। এই ম্যাচে প্রতিপক্ষ অ্যাঙ্গোলা। যদিও এটি কেবল একটি প্রস্তুতি ম্যাচ, তবুও বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনার কমতি নেই। আর স্কালোনির ঘোষিত নতুন স্কোয়াডে জায়গা পাওয়া তিন নবাগত খেলোয়াড় এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্পেনের মাটিতে অনুষ্ঠিত হবে আর্জেন্টিনার এই বছরের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১৪ নভেম্বর অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে মাঠে নামবে লিওনেল মেসির দল। প্রীতি ম্যাচ হলেও এই ম্যাচের গুরুত্ব কম নয়, কারণ এটি স্কালোনির পরিকল্পনার অংশ—নতুন প্রতিভাবানদের দেখা, ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প প্রস্তুত রাখা এবং দলের ভারসাম্য নিরীক্ষা করা। আর্জেন্টিনার ২৪ সদস্যের স্কোয়াডে এ বারই প্রথম ডাক পেয়েছেন হোয়াকিন পানিচেলি, জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি এবং ম্যাক্সিমো পেরোনে। তিন তরুণই কোচ স্কালোনির ভবিষ্যত পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এই স্কোয়াড ঘোষণার আগে থেকেই আর্জেন্টাইন গণমাধ্যমে আলোচনা চলছিল, মেসিকে ঘিরে এবারও কি তরুণদের সঙ্গে খেলার সুযোগ হবে? স্কালোনি নিশ্চিত করেছেন, মেসি দলের সঙ্গে থাকছেন এবং অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে অন্তত একটি অর্ধে তাকে মাঠে দেখা যাবে। তবে আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে থাকবেন না অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে বছরের ক্লান্তিকর সূচির কথা বিবেচনা করে। তার অনুপস্থিতিতে আস্থা রাখা হয়েছে গেরোনিমো রুলি ও ওয়াল্টার বেনিতেজের ওপর।
স্কোয়াড ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই এক ঘোষণায় চমক দেন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া। তিনি জানান, দেশীয় লিগের ক্লাবগুলোর ক্ষতি এড়াতে এই দফায় আর্জেন্টাইন লিগে খেলা কোনো খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে ডাকা হবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে স্কালোনির হাতে বাকি ছিল ইউরোপের ক্লাবে খেলা খেলোয়াড়দের নিয়েই দল সাজানোর সুযোগ। ফলে বাধ্য হয়েই দলে নতুন মুখ এনেছেন তিনি।
মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেস, রদ্রিগো দে পল, জিওভানি লো সেলসো ও অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি সুযোগ পেয়েছেন তরুণ ম্যাক্সিমো পেরোনে ও নিকো পাজ। পেরোনে, যিনি সম্প্রতি ম্যানচেস্টার সিটির যুবদলে খেলছেন, তার পারফরম্যান্সে চোখ ছিল স্কালোনির। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শনের পরই তাকে জাতীয় দলে ডাকার সিদ্ধান্ত হয়। একইভাবে ভায়ারিয়ালের তরুণ ফরোয়ার্ড জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি ও লানুসের আক্রমণভাগের প্রতিভা হোয়াকিন পানিচেলি প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন।
রক্ষণভাগেও পরিবর্তন এসেছে কিছুটা। অভিজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওতামেন্দির পাশাপাশি সুযোগ পেয়েছেন নাহুয়েল মোলিনা, হুয়ান ফয়থ, মার্কোস সেনেসি ও নিকোলাস তালিয়াফিকো। তরুণ ডিফেন্ডার ভ্যালেন্তিন বারকোও ফিরেছেন দলে, যিনি আগেও স্কোয়াডে ছিলেন কিন্তু খেলতে পারেননি। এবার তাকে সুযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্কালোনি।
এই নতুন মুখ ও তারুণ্যনির্ভর দল নিয়ে স্কালোনির লক্ষ্য ভবিষ্যতের আর্জেন্টিনা গড়া। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে আছি, যেখানে প্রতিটি ম্যাচই আমাদের জন্য শেখার সুযোগ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় কম নয়, কিন্তু দলটা প্রস্তুত রাখতে হবে। নতুন ছেলেরা ভালো করছে, তারা নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাবে।”
লিওনেল মেসির উপস্থিতি যেমন দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তেমনি তরুণদের জন্যও এটি এক বড় অনুপ্রেরণা। ৩৭ বছর বয়সী মেসি এখনও দলে অপরিহার্য। তার খেলার ধরন, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব তরুণদের জন্য এক জীবন্ত উদাহরণ। স্কালোনি চান মেসির ছায়ায় থেকেই নতুন প্রজন্ম নিজেদের শাণিত করুক।
অন্যদিকে, দলে থাকা লাওতারো মার্তিনেস, জুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গনসালেসদের মতো অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ডরা আক্রমণভাগে ভারসাম্য আনবেন। হুলিয়ান আলভারেজের সাম্প্রতিক দুর্দান্ত ফর্ম দলকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। আর প্রেস্তিয়ানি ও পানিচেলির মতো নতুনদের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করবে ফুটবলবিশ্ব, কারণ তারা ভবিষ্যতের আর্জেন্টিনার ‘গোল মেশিন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যমাঠের ভারসাম্য আর্জেন্টিনার সবসময়ই শক্তিশালী দিক। এনজো ফার্নান্দেস ও ম্যাক আলিস্টার একসঙ্গে থাকলে দলটির পাসিং গেম আরও মজবুত হয়। সঙ্গে যদি যোগ হয় দে পলের ধৈর্য ও লো সেলসোর সৃজনশীলতা, তবে অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা আবারও একতরফা ম্যাচ উপহার দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই প্রীতি ম্যাচটি শুধু ফলাফলের নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। স্কালোনির কৌশল এখন পরিষ্কার—অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশ্রণে এক ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করা। কারণ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার সামনে আছে কোপা আমেরিকা, যা হবে দল যাচাইয়ের সবচেয়ে বড় মঞ্চ।
আর্জেন্টিনা এখনো বিশ্বের ফুটবলে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা শুধু জয়ের জন্যই মাঠে নামে না, বরং প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের উন্নতির সুযোগ খোঁজে। অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচেও থাকবে সেই ধারা। নতুন মুখ, নতুন উদ্যম ও পুরোনো স্বপ্ন—এই নিয়েই আর্জেন্টিনার বছর শেষের সফর বিশ্ব ফুটবলে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে যাচ্ছে।