প্রকাশিত : ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে প্রকাশিত হলো ৪৪তম বিসিএসের সংশোধিত চূড়ান্ত ফল। প্রায় চার বছরের অপেক্ষা শেষে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বৃহস্পতিবার রাতে এই ফল প্রকাশ করে। পরীক্ষার সব ধাপ শেষে এক হাজার ৬৮১ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে “রিপিট ক্যাডার” ইস্যু। আগের দফায় সুপারিশপ্রাপ্ত ৩০৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬০ জনকে বাদ দিয়েছে পিএসসি, এবং তাদের স্থলে নন-ক্যাডার তালিকা থেকে ২৫৭ জন নতুন প্রার্থীকে সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে অনেকে হঠাৎ করেই ক্যাডার থেকে বাদ পড়েছেন, আবার অনেকের জীবনে এসেছে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগের আনন্দ।
পিএসসি জানিয়েছে, গত ৩০ জুন প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলের পর ৩০৩ জন প্রার্থী লিখিতভাবে জানান যে তারা বর্তমানে যেসব ক্যাডারে কর্মরত, সেগুলোর একই বা নিম্ন ক্যাডারে যোগ দিতে চান না। এই সংকট কাটাতে বিধি সংশোধন করা হয় এবং সেই অনুযায়ী নতুন করে যাচাই-বাছাই চালানো হয়। সংশোধিত বিধি অনুযায়ী, ৩০৩ জনের মধ্যে ২৬০ জনকে বাদ দেওয়া হয় এবং বাকি ৪৩ জনকে তাদের বর্তমান অবস্থানের চেয়ে উচ্চ পছন্দের ক্যাডারে সুপারিশ করা হয়।

এর ফলে বাদ পড়া ২৬০ জনের জায়গায় নন-ক্যাডার তালিকা থেকে ২৫৭ জনকে নতুন করে ক্যাডারে নেওয়া হয়েছে। এই নতুন সংযোজন বিসিএসের ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা। কমিশনের মতে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে “ন্যায়বিচার ও প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনায়।”
যদিও বিজ্ঞপ্তিতে এক হাজার ৭১০টি পদে নিয়োগের ঘোষণা ছিল, চূড়ান্ত ফলাফলে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন এক হাজার ৬৮১ জন প্রার্থী। অর্থাৎ ২৯টি ক্যাডার পদ শূন্য রয়ে গেছে। পিএসসি জানায়, কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় এই পদগুলোতে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয়নি।
চূড়ান্ত ফলাফলে কপাল পুড়েছে পাঁচজন প্রার্থীরও। বিএড বা এমএড সনদ না থাকায় তাদের সুপারিশ বাতিল করা হয়েছে। বাতিল প্রার্থীদের রেজিস্ট্রেশন নম্বরগুলো বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করেছে পিএসসি। তারা সবাই টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক পদে মনোনীত হয়েছিলেন।
বিএসসিতে উত্তীর্ণ হলেও পদসীমার কারণে অনেকে এবারও ক্যাডারে স্থান পাননি। তাদের সংখ্যা ৭ হাজার ৫৪৯ জন। পিএসসি জানিয়েছে, এদের মধ্যে যোগ্য প্রার্থীদের ‘নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা, ২০২৩’ অনুযায়ী নবম থেকে দ্বাদশ গ্রেড পর্যন্ত শূন্য পদে পর্যায়ক্রমে সুপারিশ করা হবে। তবে পিএসসি স্পষ্ট করেছে, এই সুযোগ কোনো প্রকার নিশ্চয়তা নয়।

২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর ৪৪তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ৭১৬ জন প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৫ হাজার ৭০৮ জন। লিখিত পরীক্ষায় পাস করেন ১১ হাজার ৭৩২ জন।
মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। ২০২৪ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া মৌখিক পরীক্ষা জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দুবার স্থগিত হয়। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন পিএসসি কমিশন আগের মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় সাক্ষাৎকারের সিদ্ধান্ত নেয়। সমস্ত যোগ্য প্রার্থীর সাক্ষাৎকার পুনরায় নেওয়া হয় এবং সেই ফলাফলের ভিত্তিতেই সংশোধিত চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়।
ফল প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ আনন্দে আপ্লুত, আবার অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাদ পড়ার কারণে। পিএসসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, “আমরা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগততা বজায় রেখেই ফলাফল প্রকাশ করেছি। যে পরিবর্তনগুলো করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ বিধি অনুযায়ী।”
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ৪৪তম বিসিএস অবশেষে পরিসমাপ্তির পথে। নতুনভাবে যোগদান করতে যাওয়া প্রার্থীদের জন্য এটি এক নতুন সূচনা, আর বাদ পড়াদের জন্য পরবর্তী প্রস্তুতির অনুপ্রেরণা। তবে এ বিসিএস প্রমাণ করে দিয়েছে—বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় পরিবর্তন, বিলম্ব ও বিতর্ক এখন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা।