যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে ইসরাইল কি বড় বাধা?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
  • ৭২ বার
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে ইসরাইল কি বড় বাধা?

প্রকাশ: ২৫ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনীতিতে নতুন এক কূটনৈতিক মোড়ের আভাস দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য একটি শান্তি ও সমঝোতা চুক্তি নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে, তখন এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইসরাইলের অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবানন ইস্যু এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ইসরাইলের কড়া অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে তেলআবিব।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে এক জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত শনিবার রাতে দুই নেতার ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ এবং দেশটির মাটিতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি করা হবে না।

এই বক্তব্যকে ইসরাইলের জন্য কূটনৈতিক স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনেক জটিল। কারণ তেহরান এখন পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত দেয়নি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স এবং তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান পারমাণবিক ইস্যুকে এখনো প্রাথমিক আলোচনার অংশ হিসেবে দেখছে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বর্তমান আলোচনা মূলত রাজনৈতিক কাঠামো ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে; পারমাণবিক প্রশ্ন পরে বিবেচনায় আসবে।

এই অবস্থান থেকেই নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ইরান সেটিকে নিজেদের সার্বভৌম অধিকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। আর এই টানাপোড়েনের মাঝেই সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ইসরাইল। বহু বছর ধরেই দেশটি দাবি করে আসছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির “বেশিরভাগই চূড়ান্ত” এবং এখন শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা চলছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সাম্প্রতিক তেহরান সফরের পর ট্রাম্পের এই মন্তব্য আরও বেশি আলোচনায় আসে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তান, কাতার ও ওমানের মতো কয়েকটি দেশ নেপথ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ এড়াতে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি এখন সমঝোতার পথ খুঁজছে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল শুরু থেকেই যেকোনো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার বিষয়ে সন্দিহান। তাদের আশঙ্কা, কূটনৈতিক আলোচনার আড়ালে ইরান সময়ক্ষেপণ করে নিজেদের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। এই কারণে নেতানিয়াহু সরকার চাইছে, কোনো ধরনের চুক্তির আগে ইরানের ওপর কঠোর ও যাচাইযোগ্য শর্ত আরোপ করা হোক।

ইসরাইলি গণমাধ্যম কান জানিয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক ফোনালাপে নেতানিয়াহু বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে। সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির অংশ হিসেবে যদি লেবানন সীমান্তে যুদ্ধবিরতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে ইসরাইলের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারণ ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে ইরানের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে দেখে আসছে।

তাসনিম সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার প্রথম ধাপে একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের নীতিগত অঙ্গীকার থাকতে পারে। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকেও লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত বা বন্ধ করার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই মূল দ্বন্দ্ব। ইসরাইল মনে করে, ইরানের সঙ্গে আপস মানেই হিজবুল্লাহ, হামাস এবং ইরানপন্থি অন্যান্য গোষ্ঠীর জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হওয়া। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের একটি অংশ মনে করছে, চলমান সংঘাত অব্যাহত থাকলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও ভয়াবহ অস্থিতিশীলতার দিকে যেতে পারে। তাই একটি সীমিত সমঝোতাও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান প্রথমে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছাতে চায় এবং এরপর ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির দিকে এগোতে চায়। তবে ইসরাইলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, এই সময়ের মধ্যে ইরান আন্তর্জাতিক চাপ কমিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক নিরাপত্তা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু প্রশাসনের ধারণা—নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর তেহরান গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক বরাবরই অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা, প্রক্সি সংঘাত এবং কূটনৈতিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এখন যদি নতুন করে কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হয়, তাহলে সেটি শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্ভাব্য এই চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বাস্তব অগ্রগতি, ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা। এর যেকোনো একটি ইস্যুতে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হলে পুরো আলোচনা আবারও ভেঙে পড়তে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মহল সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও এর গভীর প্রভাব পড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নিয়ে যতটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে, ঠিক ততটাই বাড়ছে সংশয়—আর সেই সংশয়ের কেন্দ্রে এখন ইসরাইলের ভূমিকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com