প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌরুট পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ঘাট সংকট, নদীভাঙন ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় এ নৌরুটে এখন নৌযান চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ লাইন ধরে পারাপারের অপেক্ষায় আছে শত শত যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, পিকআপ ও ব্যক্তিগত গাড়ি। যাত্রীদের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নয়।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঘাট এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পাটুরিয়ার পাঁচটি ঘাটের মধ্যে সচল আছে মাত্র একটি। ৩ নম্বর ঘাটটি চলছে জোড়াতালি দিয়ে, আর বাকি ১, ২ ও ৫ নম্বর ঘাট পুরোপুরি বন্ধ। ফলে যানবাহন পারাপারে ব্যাপক জট সৃষ্টি হয়েছে। অনেক চালক দুই-তিন দিন ধরে লাইনে অপেক্ষা করছেন পারাপারের আশায়।
ঘাট এলাকার চিত্র যেন দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। গরমে অতিষ্ঠ মানুষ, খাবার পানি ও বিশ্রামের জায়গার অভাব—সব মিলিয়ে দুর্বিষহ অবস্থা। যাত্রী ও চালকদের অনেকেই জানান, ঘাট এলাকায় রাতে নিরাপত্তার অভাব, টয়লেট ও খাবার ব্যবস্থারও তীব্র সংকট রয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙনের কারণে ঘাটগুলো ক্রমেই অচল হয়ে পড়েছে, অথচ স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কয়েক মাস আগে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও, তা পদ্মার তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। ফলে ভাঙন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

রানা শিকদার নামের এক এলাকাবাসী বলেন, “পদ্মার পানি কমলেও ভাঙন কমেনি। ঘাটের পাড়গুলো এখনো ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মাটি ধসে পড়ছে। আমরা যারা ঘাটের পাশে থাকি, সারাক্ষণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। নদী একদম ঘাটের মুখ পর্যন্ত চলে এসেছে।”
একই অভিমত প্রকাশ করেন আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ। তিনি জানান, গত কয়েক মাসে নদীতে হারিয়ে গেছে শতাধিক ঘরবাড়ি। অনেক পরিবারকে ইতিমধ্যে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এখান থেকে অন্তত ৫০টি পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় নেওয়া হয়েছে। যারা এখনো আছি, তারাও জানি না কতদিন টিকে থাকতে পারব। এই বছর যদি স্থায়ী কাজ না হয়, তাহলে আগামী বছর এই এলাকা হয়তো মানচিত্রেই থাকবে না।”
ঘাট এলাকায় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, নদীভাঙন ও ঘাট ক্ষয় এখন বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত ঘাটের পাড় ধসে পড়ছে। কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও, তা স্রোতের চাপ সহ্য করতে পারছে না। ফলে প্রতিদিন ঘাট সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় অস্থায়ীভাবে বিকল্প ঘাট ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। তবে পদ্মার তীব্র স্রোত ও নাব্যতা সংকটে বিকল্প ঘাটও টেকসই হচ্ছে না।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ। প্রতিদিন এই রুট দিয়ে হাজারো যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। কিন্তু ঘাট সংকটের কারণে এই রুটের পারাপার সময় এখন কয়েক ঘণ্টা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত।
একজন ট্রাকচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দুই দিন ধরে এখানে বসে আছি। কবে পার হব জানি না। ঘাটে খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। রাতে ঘুমানো যায় না, নিরাপত্তারও অভাব। আগে এমন ভোগান্তি কখনো দেখিনি।”
অন্যদিকে, যাত্রীদের অভিযোগ, ফেরি পারাপারে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বেড়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, ঘাটে যানবাহন উঠাতে ঘুষ ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রশাসন দাবি করছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
ঘাট এলাকার দোকানদার, শ্রমিক ও হকাররাও পড়েছেন বিপাকে। ঘাটে যাত্রী না থাকায় তাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধের পথে। অনেকেই বলছেন, ঘাট সচল না হলে তাদের জীবিকা হুমকিতে পড়বে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঘাট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঘাট রক্ষায় অস্থায়ী নয়, স্থায়ী সমাধানই এখন সময়ের দাবি। তারা বলেন, পদ্মার স্রোত ও ভাঙন প্রতি বছরই এই রুটের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত টেকসই বাঁধ, জিও টিউব বা কংক্রিট কাঠামো নির্মাণ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, “প্রতি বছরই ঘাট রক্ষায় কাজ হয়, কিন্তু তা টেকে না। হয় কাগজে থাকে, নয়তো নদীর স্রোতে ভেসে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে স্থায়ী বাঁধের উদ্যোগ না নিলে আগামী বর্ষায় পুরো পাটুরিয়া হয়তো নদীতে চলে যাবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মার এই অংশে স্রোতের গতি ও প্রবাহ ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। নদী প্রশস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তীরবর্তী এলাকা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘাটগুলো টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা মনে করেন, জরুরি ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ ও ঘাট পুনর্গঠন না করলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কিছু অস্থায়ী সংস্কারকাজ চলছে, তবে স্থায়ী সমাধান পেতে সময় লাগবে। পদ্মার প্রবল স্রোত এবং নাব্যতার পরিবর্তন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ঘাট এলাকার মানুষজন এখন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের মুখে আতঙ্ক, চোখে ক্লান্তি। কেউ ঘর হারিয়েছেন, কেউ জীবিকা হারানোর ভয়ে কাঁদছেন। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তারা শুধু একটাই কথা বলছেন— “এই বছর যদি কাজ না হয়, আগামী বছর এখানে থাকব না।”
নদীভাঙনের এই বেদনাময় বাস্তবতা যেন পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের প্রতিটি মানুষের মুখে একই আর্তনাদ তুলে দিয়েছে। সময়ের অপেক্ষা শুধু— সরকার ও প্রশাসন কি এবার স্থায়ী সমাধান আনবে, নাকি পদ্মা আবারও কেড়ে নেবে ঘাট, ঘর, জীবিকা আর মানুষের স্বপ্ন?