নয়াপল্টনে বিএনপির বিপ্লব ও সংহতি দিবসে জনস্রোতে মুখর রাজধানী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২১ বার
নয়াপল্টনে বিএনপির বিপ্লব ও সংহতি দিবসে জনস্রোতে মুখর রাজধানী

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীকে ঘিরে রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টন আজ শুক্রবার রূপ নিয়েছে জনস্রোতে। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতাকর্মীরা ঢল নামান বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা পরিণত হয় স্লোগান, ব্যানার, ফেস্টুন ও দলীয় পতাকায় মোড়ানো উৎসবমুখর এক মিলনমেলায়।

দুপুর দেড়টার পর থেকেই রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশসহ আশপাশের জেলা থেকে একের পর এক মিছিল এসে জমায়েত হতে থাকে নয়াপল্টনে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষকদলসহ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নানা সাজে সজ্জিত হয়ে অংশ নেন শোভাযাত্রায়। কেউ হাতে প্ল্যাকার্ড, কেউ দলীয় পতাকা, আবার কেউ পিকআপ ট্রাক ও ভ্যানে তৈরি প্রতীকী প্রদর্শনী নিয়ে আসেন। স্লোগানে মুখর জনতার কণ্ঠে তখন বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল— “৭ নভেম্বরের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হোন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনুন।”

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সহ–প্রচার সম্পাদক আসাদুল শাহিন এবং সহ–যুববিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ মঞ্চে আসেন। তাঁদের আগমনেই জনতার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় নেতারা মঞ্চে উঠে স্লোগানে সাড়া দেন এবং জনগণকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

ড. আবদুল মঈন খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “৭ নভেম্বরের চেতনা হলো জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সেই চেতনা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। যারা গণতন্ত্রকে বন্দি করেছে, জনগণের কণ্ঠরোধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আজকের এই বিপ্লবের দিন নতুন শপথের দিন।”

সভাস্থলে উপস্থিত বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নেতাকর্মীরা জানান, দীর্ঘদিন পর নয়াপল্টনে এমন উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। অনেকেই বলেন, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যেও বিএনপির এই গণসমাবেশ জনগণের আস্থার প্রতিফলন।

নয়াপল্টন ও আশপাশের এলাকাজুড়ে তখন জনতার ঢল সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। তবে কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

র‌্যালি ঘিরে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় প্রতীকী প্রতিবাদমূলক প্রদর্শনী। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের এক পিকআপ ট্রাকে তৈরি করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রতীকী মডেল। সেখানে কয়েদির পোশাকে ছয়জন ব্যক্তি অবস্থান করেন, যাদের শরীরে লেখা ছিল— “আমরা সবাই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর দালাল।” একই ট্রাকে আরেক ব্যক্তির গায়ে লেখা— “আমি সালমান, আমি ব্যাংক লুট করি” এবং “আমি আনিসুল, আমি আইনমন্ত্রী, আমি আইন ভঙ্গ করি”— এমন ব্যঙ্গাত্মক বার্তা।

আরেকটি ভ্যানে দেখা যায় লোহার খাঁচার ভেতর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি, যা মুহূর্তেই জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেকে মোবাইলে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

এই ব্যতিক্রমী প্রতীকী প্রদর্শনী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ এটিকে “রাজনৈতিক প্রতিবাদের শিল্পিত রূপ” বলে প্রশংসা করেন, আবার কেউ একে “অশালীন ও ব্যক্তিগত আক্রমণ” বলে সমালোচনা করেন। তবে বিএনপির নেতারা দাবি করেন, এগুলো জনগণের দুঃখ-অসন্তোষের প্রতিফলন, যা সরকারের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিপ্লব ও সংহতি দিবসের এই সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের অংশ হিসেবে বিএনপি সারাদেশে একযোগে আলোচনা সভা, র‌্যালি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। নয়াপল্টনের প্রধান সভাটি ছিল কেন্দ্রীয় কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু। আলোচনা সভা শেষে বিএনপি নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করে, যা ফকিরাপুল, কমলাপুর ও শান্তিনগর ঘুরে কারওয়ান বাজারে গিয়ে শেষ হয়।

র‌্যালিতে অংশ নেওয়া এক যুবদল কর্মী বলেন, “আমরা আজ ৭ নভেম্বরের চেতনায় নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। সরকার যতই বাধা দিক, আমরা মাঠে থাকব, আন্দোলন চালিয়ে যাব।”

অন্যদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যানজটের সৃষ্টি হলেও জনতার অংশগ্রহণে ছিল উচ্ছ্বাস ও শৃঙ্খলা। নয়াপল্টন এলাকার দোকানপাট ও ফুটপাতের অনেক দোকান আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে কোথাও বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপি এই বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। তারা মনে করেন, জাতীয় রাজনীতিতে পুনরায় জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা জাগাতে এই কর্মসূচি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

৭ নভেম্বরকে বিএনপি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে “সৈনিক ও বেসামরিক জনগণের ঐক্যের দিন” হিসেবে দেখে থাকে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালের এই দিনে ক্ষমতার পালাবদলকে তারা জাতীয় ঐক্য ও বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করে। তবে ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যায় আওয়ামী লীগ ও বাম রাজনৈতিক দলগুলো একে ‘বিপর্যয়ের দিন’ বলে মনে করে।

তবু বিএনপির কাছে এই দিনটি আজও তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নয়াপল্টনে আজকের এই জনসমাবেশ যেন সেই ইতিহাসকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল— যে দলের জন্ম গণমানুষের আন্দোলন থেকে, তাদের প্রাণশক্তি এখনো রাজপথেই নিহিত।

দিবসটির র‌্যালি শেষে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত নয়াপল্টনে ছিল উচ্ছ্বসিত জনতার ভিড়। আলো, স্লোগান ও সংগীতের মিশেলে এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয় এলাকাজুড়ে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেন, “আজকের সমাবেশ প্রমাণ করেছে, বিএনপি এখনো জনগণের হৃদয়ে বেঁচে আছে।”

রাজধানীর রাজনৈতিক ইতিহাসে নয়াপল্টনের এই শুক্রবারের বিকেল তাই হয়তো থেকে যাবে এক নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে— যেখানে হাজারো কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি, আর পুনরায় জেগে উঠেছে ৭ নভেম্বরের চেতনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত